বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অন্যতম অনুঘটক বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি দিয়েছে সুখ-স্বস্তি-স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু বর্তমানে সিলেটে বিদ্যুৎ পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়াটাই যেন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তীব্র লোডশেডিংয়ে নাজেহাল দশা সিলেট মহানগরীসহ জেলার ১৩টি উপজেলার। একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে প্রচণ্ড গরমে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম সিলেটবাসীর। বিদ্যুৎ না থাকায়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, বাসাবাড়িতে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালগুলোর জরুরি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনায় ঘটছে ব্যাঘাত।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিড থেকে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, বিশ্ববাজার ও ডলারসংকটের কারণে জ্বালানি ঘাটতি এবং স্থানীয় উৎপাদনকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটজুড়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিদ্যুৎঘাটতি। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে বিদ্যুতের প্রতিদিনের মোট চাহিদা প্রায় ৪৭৭ মেগাওয়াট।
এর মধ্যে সিলেট মহানগর ও আশপাশের শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে চাহিদা ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। আর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় চাহিদা প্রায় ৩০৭ মেগাওয়াট। বর্তমানে মোট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সিলেটে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট, যা মূল চাহিদার অর্ধেকেরও কম। দিনে ও রাতে পিক আওয়ারে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে বাধ্য হয়েই এলাকাভিত্তিক ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
কোথাও কোথাও এক ঘণ্টা পরপর দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। নগরীর জিন্দাবাজার, উপশহর, আম্বরখানা, টিলাগড়, নয়াসড়ক এবং দক্ষিণ সুরমাসহ পিডিবির আওতাধীন এলাকাগুলোয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। শহরের অনেক স্থানে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী এক থেকে দেড় ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বনাথ, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, ফেঞ্চুগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জসহ পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন উপজেলাগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক।
গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকেরা অভিযোগ করেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। উপজেলার অনেক এলাকায় একটানা তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সার্বিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র ও প্রকৌশলীদের মতে, সিলেট অঞ্চলের এই তীব্র বিদ্যুৎসংকটের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বর্তমানে সারা দেশে পিক-আওয়ারে দৈনিক প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে উৎপাদন ও সরবরাহ হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ফলে জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিলেট অঞ্চলে। দ্বিতীয়ত, দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর কারিগরি জটিলতা এবং ডলারসংকটে প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্রাথমিক জ্বালানি, অর্থাৎ এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও কয়লা আমদানি করতে না পারায় সারা দেশের একাধিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না।
তৃতীয়ত, সিলেটে অবস্থিত তিনটি স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে হঠাৎ কারিগরি ও যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেওয়ায় সেখান থেকেও আশানুরূপ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি সিলেটের আঞ্চলিক পাওয়ার গ্রিডকে আরও বেশি ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছর নাগাদ কাগজে-কলমে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দেখানো হয়েছিল প্রায় ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট।
সেই সময় পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলেও অলস বসে থাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে কেবল ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করে কৃত্রিমভাবে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তি নবায়ন না হওয়া এবং কিছু রেন্টাল প্ল্যান্ট বন্ধ হওয়ায় পরবর্তীকালে কার্যকর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে প্রায় ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াটে নেমে আসে।
বিগত সরকারের আমলে বিপুল বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত বিদ্যুৎ খাতের বিলম্বিত বিল ও বকেয়া ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বর্তমানে পাহাড়সম। ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিশাল আর্থিক লোকসান সামাল দিতে হচ্ছে। বর্তমানে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও বকেয়া পাওনার চাপে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও এলএনজি চড়া মূল্যে আমদানি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফলে বিগত সরকারের শেষ সময়ের মতো ঋণ করে বা ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখার সাময়িক কৌশল এখন আর কাজ করছে না। সূত্রের দাবি, তৎকালীন সময়ে যে অবকাঠামো দিয়ে কাগজে-কলমে অতিরিক্ত ক্ষমতার কথা বলা হতো, এখন সত্যিকারের জ্বালানি ও আর্থিক সংকটে পড়ে সেই বিদ্যুৎ খাত তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক ও সরবরাহ সংকটে ভুগছে। যার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সিলেটসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষকে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক রাখা এবং সম্পূর্ণ পাওয়ার সিস্টেম বিপর্যয় বা ‘সিস্টেম কলাপস’ রোধ করতে সেন্ট্রাল লোড ডেসপাচ সেন্টারের সংকেত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিডার বন্ধ করে বিদ্যুতের লোড ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিপিডিবি সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটের স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৌশলগত মেরামত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব নয় বলে বিদ্যুৎ বিভাগের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।






















