আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২%

পার্বত্যঞ্চলের সবুজের সমারোহে কেন চাঁদাবাজি ও রক্তক্ষরণ?

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:36:48 pm, Sunday, 9 August 2026
  • 76

পার্বত্যঞ্চলের সবুজের সমারোহে কেন চাঁদাবাজি ও রক্তক্ষরণ?

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পার্বত্য বাংলাদেশ—সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী আর কুয়াশায় ঘেরা উপত্যকার এক অপরূপ ক্যানভাস। ভৌগোলিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর এই অঞ্চলটি যেকোনো পর্যটকের চোখে এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে।

কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের অন্তরালে ঢেকে আছে এক বিভীষিকাময় রূপ। পাহাড়ের গাঢ় সবুজের ছায়ায় প্রতিদিন রচিত হচ্ছে রক্ত, ভয় এবং শোষণের অদেখা ইতিহাস। পাহাড়ি জনপদে আইন বা সংবিধানের শাসন নয়, বরং বন্দুকের নলের জোরে বলবৎ রয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার দাপট। সবুজ পাহাড়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল ও রক্তাক্ত শাসনব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব ঝুলছে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর দয়ার ওপর।

সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য ও সূত্রের মাধ্যমে পাহাড়ের যে কদর্য ছবি উন্মোচিত হয়েছে, তা শুধু উদ্বেগের নয়, বরং যেকোনো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। গত মাত্র এক বছরে পার্বত্য এলাকায় ১০৫টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ।

একই সময়ে অপহৃত হয়েছেন ৪৮ জন—যাদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য, সাধারণ বাঙালি, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার, এমনকি শ্রমজীবী দিনমজুরও। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, পাহাড়ে কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে এক বছরে আদায় করা চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা! পাহাড় এখন একটি সুসংগঠিত ‘অর্থনৈতিক অপরাধ অঞ্চল’ বা *Extortion-driven Conflict Zone*-এ পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, দেশের একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডে প্রকাশ্যে কীভাবে এমন ভয়ংকর অপরাধ চক্র টিকে থাকে? কেন দশকের পর দশক ধরে রক্তে ভিজছে পাহাড়ি উপত্যকা? পাহাড়ের সাম্প্রতিক সংঘাত কেবল কোনো সামাজিক বা জাতিগত অসন্তোষের ফল নয়; এটি মূলত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ আয়ের ভাগ বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিভীষিকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে অন্তত ছয়টি বড় সশস্ত্র সংগঠন অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল),জেএসএস (সংস্কার),ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল),ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক),কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও মারমা ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি)।

এই সংগঠনগুলোর মধ্যে মূল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হলো জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফ (মূল)। পাহাড়ে রাজনৈতিক আদর্শের যে ছদ্মবেশ এরা ধারণ করে থাকে, তার ভেতরের আসল চেহারাটি হলো অর্থ আদায় ও ভৌগোলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ‘কমান্ড এরিয়া’ বজায় রাখতে তারা একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। গত এক বছরে নিহত ২৬ জনের মধ্যে ২৪ জনই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং ২ জন বাঙালি।

আর আহত ১৬ জন উপজাতি ও ২৩ জন বাঙালি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই হিংস্রতা কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রক্ষার জন্য নয়; বরং তারা সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিককেই সমানভাবে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। দুর্গম ও সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হামলা চালিয়ে তারা সহজেই ভারতের বা মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে যায়।

এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে পৌঁছানোর আগেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়। এভাবে ভৌগোলিক সীমান্তকে তারা নিজেদের অপরাধ ঢাকার এবং নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রকৃতপক্ষে পাহাড়ের সশস্ত্র দলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং আধুনিক অস্ত্র কেনার মূল জ্বালানি হলো এই ভয়ংকর চাঁদাবাজির অর্থনীতি। হিসাব অনুযায়ী, বছরে ১,০৫৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার চাঁদাবাজি কোনো স্বাভাবিক অপরাধমূলক ঘটনা নয়, এটি একটি অঘোষিত মাফিয়া চালিত রাষ্ট্রীয় সমান্তরাল রাজস্ব ব্যবস্থা।

জেলাভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের মতো করে তারা রাঙামাটিতে ৭৩৪ কোটি, খাগড়াছড়িতে ২৫৮ কোটি এবং বান্দরবানে ৬২ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদার উৎস থেকে বাদ যায় না কিছুই। পাহাড়ে চলাচলকারী ছোট-বড় যানবাহন, স্থানীয় হাট-বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবজি বা ফলের চাষী, কলা ও বাঁশ ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ জুমচাষী পর্যন্ত—সবাইকে নির্দিষ্ট হারে এই চাঁদা বা ‘ট্যাক্স’ দিতে হয়।

এই অর্থ আদায়ের কৌশল অত্যন্ত বর্বরোচিত। চাহিদামতো চাঁদা না পেলেই নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। গত এক বছরে যে ৪৮ জন অপহৃত হয়েছেন, তাদের সিংহভাগকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চাঁদা আদায়ের প্রেশার গ্রুপ হিসেবে। এর শিকার হচ্ছেন মোবাইল টাওয়ারের মেকানিক, ব্রিজ ও রাস্তা নির্মাণের প্রকৌশলী, ড্রাইভার এবং সাইট ম্যানেজাররা। এর সরাসরি আঘাত পড়ছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর।

দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল বা হাসপাতাল নির্মাণের কাজ নিয়ে কোনো ঠিকাদার যেতে সাহসী হচ্ছেন না। যেসব কাজ হচ্ছে, তার একটা বিশাল অংকের টাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেটে চলে যাওয়ায় কাজের গুণগত মান খারাপ হচ্ছে অথবা প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে থাকছে। এর ফলে পাহাড়ে বাস করা সাধারণ নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি নাগরিকরা আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, সশস্ত্র সংগঠনগুলো পাহাড়িদের অধিকারের কথা বললেও, আদতে তাদের দরিদ্র ও অনগ্রসর করে রেখেই নিজেদের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক সুরক্ষার এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সীমান্তে উপনীত হয়েছে।

গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যমতে, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র সঙ্গে বাংলাদেশের ইউপিডিএফ (মূল) এবং কেএনএফ-এর সরাসরি যোগাযোগের ভয়ংকর প্রমাণ মিলছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির যে জোরালো সামরিক অবস্থান রয়েছে, তারা বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলোকে নিজেদের কৌশলগত রসদ সরবরাহ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

বিনিময়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র দলগুলোকে অস্ত্র, অত্যাধুনিক গোলাবারুদ প্রদান এবং দুর্গম পাহাড়ের গোপন ক্যাম্পে গেরিলা ট্রেনিং দিচ্ছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা দেয়। বিদেশি অস্ত্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরির এক আন্তর্জাতিক নীলকোট কাজ করছে। সীমান্ত অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র পাচারের এই নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার চক্রান্ত বৈ কিছু নয়।

সাধারণ পাহাড়িদের জীবন কতটা অসহায় ও নিরাপত্তাহীন, তা তাদের আত্মকথন শুনলেই অনুধাবন করা যায়। সশস্ত্র দলের প্রাক্তন সদস্যদের জবানবন্দিতে উঠে আসে কীভাবে অভাব, ভয় ও বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে যুবকদের এই পথে টানা হয়। সংকটের গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, কেএনএ-এর (কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি) সাবেক সদস্য জোসেফ বম (ছদ্মনাম) ২০২২ সালে চরম অর্থসংকট ও প্ররোচনায় পড়ে দলে যোগ দিয়েছিলেন।

টাইগার পাড়ার একটি মিনি ক্যাম্পে থেকে এলাকার নিরীহ ও গরিব মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়ে টাকা আদায় করাই ছিল তাদের কাজ। জোসেফের ভাষ্যমতে, “এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নিরীহ ও গরিব। এদের অনেকের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। কেউ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর আজ সে শান্তিতে থাকলেও প্রতিনিয়ত বেঁচে আছে সশস্ত্র সঙ্গীদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণের চরম আতঙ্কে।

একইভাবে, জেএসএস-এর সাবেক সদস্য ৩৭ বছর বয়সী থেইন মং মারমার (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে সশস্ত্র দলগুলোর অমানবিক কাঠামোকে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সীমান্ত এলাকায় ট্রেনিং নিয়ে দলে বাবুর্চির কাজ করতেন তিনি। অবিবাহিত সদস্যদের পকেট খরচ হিসেবে দেওয়া হতো মাত্র ৫০০ টাকা, আর সংসার থাকলে দেওয়া হতো ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। অর্থাৎ, সামান্য কিছু টাকার লোভ ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তরুণের জীবন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।

চার বছর ধরে দলের নিয়ন্ত্রণে কাজ করার পর ৯ মাস আগে তিনি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এবং এখন জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই গল্পগুলো প্রমাণ করে যে, পাহাড়ে সশস্ত্র দলগুলোর মূল ক্যাডার ছাড়া সাধারণ সদস্য বা আমজনতা কেউ শান্তিতে নেই। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ যুবসমাজকে অপরাধের পঙ্কিল পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা একটি সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল।

পাহাড়ের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কেবল সমতলে অস্ত্র হাতে লড়াই করছে না, তারা বিশ্বজুড়ে ছড়িছে এক সুসূক্ষ্ম ‘তথ্যযুদ্ধ’ বা *Information Warfare*। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভুয়া ওয়েব পোর্টাল এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সার্বিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিরতিহীন মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম (UNPFII)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় তারা বাংলাদেশকে একটি ‘পীড়নকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করে। তারা পাহাড়ে ঘটে যাওয়া তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ হত্যা, রক্তক্ষরণ এবং চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধগুলোকে চেপে রেখে, বিষয়টিকে সম্পূর্ণ জাতিগত বা ধর্মীয় নির্যাতনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

এই আন্তর্জাতিক লবিংয়ের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে হেয় করা, বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ ব্যাহত করা এবং পাহাড়ে যেকোনো শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করা। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি এক প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ। পাহাড় যখন প্রতিদিন হত্যা, অপহরণ ও হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজিতে তোলপাড়, তখন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা চরম হতাশার ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।

মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে হতবাক করে। উদাহরণস্বরূপ, বান্দরবানের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে চরম ঔদাসীন্য ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা ফুটে উঠেছে। যখন সরকারি তথ্যে স্পষ্ট বলা হচ্ছে বছরে ১০৫টি সংঘর্ষে ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে, তখন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, *”আমরা নিরাপদে আছি, এখানে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা নেই।

“* এক বছরে ২৬ জন নিহতের পরিসংখ্যানকে অত্যন্ত হালকাভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়—সমতলে নাকি এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়! চাঁদাবাজির মাত্রাকেও সমতলের চেয়ে বেশি নয় বলে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশাসনের এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং মাঠপর্যায়ের ভুক্তভোগী মানুষের ক্ষতে নুনের ছিট ছিটিয়ে দেওয়ার মতো। দুর্গম পাহাড়ি পথে অস্ত্র আসা কঠিন কিংবা মূল শহরের চেকপোস্ট পেরিয়ে অস্ত্র ঢোকা সম্ভব নয়—এমন অসার যুক্তি দিয়ে পাহাড়ের বিস্তৃত সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ককে অস্বীকার করা যায় না।

মানুষ কেন থানায় অভিযোগ করতে যাচ্ছে না—তার উত্তরে ‘হেডম্যানের মাধ্যমে সমাধান হওয়া’র কথা বলা হলেও আসল সত্য হলো, সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিশোধের ভয়ে সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে মামলা করার দুঃসাহস পায় না। পুলিশ প্রশাসনের এমন নমনীয় ও উদাসীন মনোভাব মূল অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এমন অস্বীকার করার মানসিকতা বা *Denial Mode* পাহাড়ের রক্তক্ষরণকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে।

পাহাড়ের সবুজে ঘেরা অরণ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা কোনো একদিনের কাজ নয়, আবার কেবল আশ্বাসের গল্প শুনিয়েও এটি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জিরো টলারেন্স নীতি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। ১.পাহাড়ে সক্রিয় ছয়টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন ও কঠোর সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। তাদের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্ত পারাপারের গোপন পথগুলো সম্পূর্ণ সিল করে দিতে হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপস্থিতি ও নজরদারি দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় আরও শক্তিশালী করতে হবে। ২.এক হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে তাদের অর্থ সরবরাহের রুট বা *Financial Trail* বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ী, ঠিকাদার বা পরিবহন মালিকরা যাতে চাঁদা দিতে বাধ্য না হন, তার জন্য নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে হবে।

গোপন চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৩.স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা জোসেফ বম বা থেইন মং মারমার মতো ভুল পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং আইনি সুরক্ষা দিতে হবে, যেন তারা সন্ত্রাসী দলগুলোর প্রতিশোধের শিকার না হয়।

৪.স্থানীয় পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে অকার্যকর বা উদাসীন ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পাহাড়ে সংঘটিত প্রতিটি হত্যা ও অপহরণের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। থানাকে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার জায়গায় পরিণত করতে হবে। ৫.জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামসহ আন্তর্জাতিক মহলে পাহাড়ে সশস্ত্র দলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির প্রকৃত তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরতে হবে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চালানো তথ্যযুদ্ধকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভুল প্রমাণ করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই,সবুজের সমারোহে ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। এই পাহাড় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, আর এখানকার সাধারণ মানুষও কোনো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক নয়। পার্বত্য চুক্তির দীর্ঘ বছর পার হয়ে গেলেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি না আসার প্রধান অন্তরায় এই অবৈধ অস্ত্র ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির রাজনীতি।

পাহাড়ের রক্তাক্ত বাস্তবতা ঢেকে রাখার দিন শেষ। যদি এখনই এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ভূখণ্ডটি অচিরেই একটি স্থায়ী অপরাধমূলক জোনে পরিণত হবে, যা বাংলাদেশের সার্বিক জাতীয় অখণ্ডতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। পাহাড়ের সাধারণ নিরপরাধ মানুষ কেবল শান্তিতে ঘুমাতে চায়; তারা চাঁদাবাজির ভয় মুক্ত, অস্ত্রের শব্দহীন এক নতুন সকাল চায়।

সেই অধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। পাহাড়ে সবুজের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতেই হবে—এটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দাবি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

গাজীপুরে থাপ্পড়কাণ্ড: হুমকি ও মামলার মুখে পরিবারসহ ‘আত্মগোপনে’ বডি বিল্ডার রুমি

পার্বত্যঞ্চলের সবুজের সমারোহে কেন চাঁদাবাজি ও রক্তক্ষরণ?

Update Time : 10:36:48 pm, Sunday, 9 August 2026

পার্বত্য বাংলাদেশ—সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী আর কুয়াশায় ঘেরা উপত্যকার এক অপরূপ ক্যানভাস। ভৌগোলিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর এই অঞ্চলটি যেকোনো পর্যটকের চোখে এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে।

কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের অন্তরালে ঢেকে আছে এক বিভীষিকাময় রূপ। পাহাড়ের গাঢ় সবুজের ছায়ায় প্রতিদিন রচিত হচ্ছে রক্ত, ভয় এবং শোষণের অদেখা ইতিহাস। পাহাড়ি জনপদে আইন বা সংবিধানের শাসন নয়, বরং বন্দুকের নলের জোরে বলবৎ রয়েছে এক অদৃশ্য ক্ষমতার দাপট। সবুজ পাহাড়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল ও রক্তাক্ত শাসনব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব ঝুলছে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর দয়ার ওপর।

সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য ও সূত্রের মাধ্যমে পাহাড়ের যে কদর্য ছবি উন্মোচিত হয়েছে, তা শুধু উদ্বেগের নয়, বরং যেকোনো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। গত মাত্র এক বছরে পার্বত্য এলাকায় ১০৫টি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ।

একই সময়ে অপহৃত হয়েছেন ৪৮ জন—যাদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য, সাধারণ বাঙালি, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার, এমনকি শ্রমজীবী দিনমজুরও। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, পাহাড়ে কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে এক বছরে আদায় করা চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা! পাহাড় এখন একটি সুসংগঠিত ‘অর্থনৈতিক অপরাধ অঞ্চল’ বা *Extortion-driven Conflict Zone*-এ পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, দেশের একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডে প্রকাশ্যে কীভাবে এমন ভয়ংকর অপরাধ চক্র টিকে থাকে? কেন দশকের পর দশক ধরে রক্তে ভিজছে পাহাড়ি উপত্যকা? পাহাড়ের সাম্প্রতিক সংঘাত কেবল কোনো সামাজিক বা জাতিগত অসন্তোষের ফল নয়; এটি মূলত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ আয়ের ভাগ বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত বিভীষিকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে অন্তত ছয়টি বড় সশস্ত্র সংগঠন অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল),জেএসএস (সংস্কার),ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল),ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক),কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও মারমা ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি)।

এই সংগঠনগুলোর মধ্যে মূল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হলো জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফ (মূল)। পাহাড়ে রাজনৈতিক আদর্শের যে ছদ্মবেশ এরা ধারণ করে থাকে, তার ভেতরের আসল চেহারাটি হলো অর্থ আদায় ও ভৌগোলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ‘কমান্ড এরিয়া’ বজায় রাখতে তারা একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। গত এক বছরে নিহত ২৬ জনের মধ্যে ২৪ জনই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং ২ জন বাঙালি।

আর আহত ১৬ জন উপজাতি ও ২৩ জন বাঙালি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই হিংস্রতা কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রক্ষার জন্য নয়; বরং তারা সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিককেই সমানভাবে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। দুর্গম ও সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হামলা চালিয়ে তারা সহজেই ভারতের বা মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে যায়।

এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে পৌঁছানোর আগেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়। এভাবে ভৌগোলিক সীমান্তকে তারা নিজেদের অপরাধ ঢাকার এবং নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রকৃতপক্ষে পাহাড়ের সশস্ত্র দলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং আধুনিক অস্ত্র কেনার মূল জ্বালানি হলো এই ভয়ংকর চাঁদাবাজির অর্থনীতি। হিসাব অনুযায়ী, বছরে ১,০৫৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার চাঁদাবাজি কোনো স্বাভাবিক অপরাধমূলক ঘটনা নয়, এটি একটি অঘোষিত মাফিয়া চালিত রাষ্ট্রীয় সমান্তরাল রাজস্ব ব্যবস্থা।

জেলাভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের মতো করে তারা রাঙামাটিতে ৭৩৪ কোটি, খাগড়াছড়িতে ২৫৮ কোটি এবং বান্দরবানে ৬২ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদার উৎস থেকে বাদ যায় না কিছুই। পাহাড়ে চলাচলকারী ছোট-বড় যানবাহন, স্থানীয় হাট-বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবজি বা ফলের চাষী, কলা ও বাঁশ ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ জুমচাষী পর্যন্ত—সবাইকে নির্দিষ্ট হারে এই চাঁদা বা ‘ট্যাক্স’ দিতে হয়।

এই অর্থ আদায়ের কৌশল অত্যন্ত বর্বরোচিত। চাহিদামতো চাঁদা না পেলেই নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। গত এক বছরে যে ৪৮ জন অপহৃত হয়েছেন, তাদের সিংহভাগকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চাঁদা আদায়ের প্রেশার গ্রুপ হিসেবে। এর শিকার হচ্ছেন মোবাইল টাওয়ারের মেকানিক, ব্রিজ ও রাস্তা নির্মাণের প্রকৌশলী, ড্রাইভার এবং সাইট ম্যানেজাররা। এর সরাসরি আঘাত পড়ছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর।

দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল বা হাসপাতাল নির্মাণের কাজ নিয়ে কোনো ঠিকাদার যেতে সাহসী হচ্ছেন না। যেসব কাজ হচ্ছে, তার একটা বিশাল অংকের টাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেটে চলে যাওয়ায় কাজের গুণগত মান খারাপ হচ্ছে অথবা প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে থাকছে। এর ফলে পাহাড়ে বাস করা সাধারণ নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি নাগরিকরা আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, সশস্ত্র সংগঠনগুলো পাহাড়িদের অধিকারের কথা বললেও, আদতে তাদের দরিদ্র ও অনগ্রসর করে রেখেই নিজেদের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক সুরক্ষার এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সীমান্তে উপনীত হয়েছে।

গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যমতে, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র সঙ্গে বাংলাদেশের ইউপিডিএফ (মূল) এবং কেএনএফ-এর সরাসরি যোগাযোগের ভয়ংকর প্রমাণ মিলছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির যে জোরালো সামরিক অবস্থান রয়েছে, তারা বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলোকে নিজেদের কৌশলগত রসদ সরবরাহ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

বিনিময়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র দলগুলোকে অস্ত্র, অত্যাধুনিক গোলাবারুদ প্রদান এবং দুর্গম পাহাড়ের গোপন ক্যাম্পে গেরিলা ট্রেনিং দিচ্ছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা দেয়। বিদেশি অস্ত্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরির এক আন্তর্জাতিক নীলকোট কাজ করছে। সীমান্ত অপরাধ, মাদক ও অস্ত্র পাচারের এই নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার চক্রান্ত বৈ কিছু নয়।

সাধারণ পাহাড়িদের জীবন কতটা অসহায় ও নিরাপত্তাহীন, তা তাদের আত্মকথন শুনলেই অনুধাবন করা যায়। সশস্ত্র দলের প্রাক্তন সদস্যদের জবানবন্দিতে উঠে আসে কীভাবে অভাব, ভয় ও বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে যুবকদের এই পথে টানা হয়। সংকটের গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, কেএনএ-এর (কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি) সাবেক সদস্য জোসেফ বম (ছদ্মনাম) ২০২২ সালে চরম অর্থসংকট ও প্ররোচনায় পড়ে দলে যোগ দিয়েছিলেন।

টাইগার পাড়ার একটি মিনি ক্যাম্পে থেকে এলাকার নিরীহ ও গরিব মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়ে টাকা আদায় করাই ছিল তাদের কাজ। জোসেফের ভাষ্যমতে, “এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নিরীহ ও গরিব। এদের অনেকের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। কেউ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর আজ সে শান্তিতে থাকলেও প্রতিনিয়ত বেঁচে আছে সশস্ত্র সঙ্গীদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণের চরম আতঙ্কে।

একইভাবে, জেএসএস-এর সাবেক সদস্য ৩৭ বছর বয়সী থেইন মং মারমার (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে সশস্ত্র দলগুলোর অমানবিক কাঠামোকে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সীমান্ত এলাকায় ট্রেনিং নিয়ে দলে বাবুর্চির কাজ করতেন তিনি। অবিবাহিত সদস্যদের পকেট খরচ হিসেবে দেওয়া হতো মাত্র ৫০০ টাকা, আর সংসার থাকলে দেওয়া হতো ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। অর্থাৎ, সামান্য কিছু টাকার লোভ ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তরুণের জীবন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।

চার বছর ধরে দলের নিয়ন্ত্রণে কাজ করার পর ৯ মাস আগে তিনি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন এবং এখন জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই গল্পগুলো প্রমাণ করে যে, পাহাড়ে সশস্ত্র দলগুলোর মূল ক্যাডার ছাড়া সাধারণ সদস্য বা আমজনতা কেউ শান্তিতে নেই। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ যুবসমাজকে অপরাধের পঙ্কিল পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা একটি সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল।

পাহাড়ের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কেবল সমতলে অস্ত্র হাতে লড়াই করছে না, তারা বিশ্বজুড়ে ছড়িছে এক সুসূক্ষ্ম ‘তথ্যযুদ্ধ’ বা *Information Warfare*। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভুয়া ওয়েব পোর্টাল এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সার্বিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিরতিহীন মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম (UNPFII)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় তারা বাংলাদেশকে একটি ‘পীড়নকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করে। তারা পাহাড়ে ঘটে যাওয়া তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ হত্যা, রক্তক্ষরণ এবং চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধগুলোকে চেপে রেখে, বিষয়টিকে সম্পূর্ণ জাতিগত বা ধর্মীয় নির্যাতনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

এই আন্তর্জাতিক লবিংয়ের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে হেয় করা, বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ ব্যাহত করা এবং পাহাড়ে যেকোনো শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করা। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি এক প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ। পাহাড় যখন প্রতিদিন হত্যা, অপহরণ ও হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজিতে তোলপাড়, তখন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা চরম হতাশার ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।

মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে হতবাক করে। উদাহরণস্বরূপ, বান্দরবানের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে চরম ঔদাসীন্য ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা ফুটে উঠেছে। যখন সরকারি তথ্যে স্পষ্ট বলা হচ্ছে বছরে ১০৫টি সংঘর্ষে ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে, তখন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, *”আমরা নিরাপদে আছি, এখানে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা নেই।

“* এক বছরে ২৬ জন নিহতের পরিসংখ্যানকে অত্যন্ত হালকাভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়—সমতলে নাকি এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়! চাঁদাবাজির মাত্রাকেও সমতলের চেয়ে বেশি নয় বলে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশাসনের এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং মাঠপর্যায়ের ভুক্তভোগী মানুষের ক্ষতে নুনের ছিট ছিটিয়ে দেওয়ার মতো। দুর্গম পাহাড়ি পথে অস্ত্র আসা কঠিন কিংবা মূল শহরের চেকপোস্ট পেরিয়ে অস্ত্র ঢোকা সম্ভব নয়—এমন অসার যুক্তি দিয়ে পাহাড়ের বিস্তৃত সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ককে অস্বীকার করা যায় না।

মানুষ কেন থানায় অভিযোগ করতে যাচ্ছে না—তার উত্তরে ‘হেডম্যানের মাধ্যমে সমাধান হওয়া’র কথা বলা হলেও আসল সত্য হলো, সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিশোধের ভয়ে সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে মামলা করার দুঃসাহস পায় না। পুলিশ প্রশাসনের এমন নমনীয় ও উদাসীন মনোভাব মূল অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এমন অস্বীকার করার মানসিকতা বা *Denial Mode* পাহাড়ের রক্তক্ষরণকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে।

পাহাড়ের সবুজে ঘেরা অরণ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা কোনো একদিনের কাজ নয়, আবার কেবল আশ্বাসের গল্প শুনিয়েও এটি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জিরো টলারেন্স নীতি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। ১.পাহাড়ে সক্রিয় ছয়টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যহীন ও কঠোর সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। তাদের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্ত পারাপারের গোপন পথগুলো সম্পূর্ণ সিল করে দিতে হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপস্থিতি ও নজরদারি দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় আরও শক্তিশালী করতে হবে। ২.এক হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে তাদের অর্থ সরবরাহের রুট বা *Financial Trail* বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ী, ঠিকাদার বা পরিবহন মালিকরা যাতে চাঁদা দিতে বাধ্য না হন, তার জন্য নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে হবে।

গোপন চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৩.স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যারা জোসেফ বম বা থেইন মং মারমার মতো ভুল পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং আইনি সুরক্ষা দিতে হবে, যেন তারা সন্ত্রাসী দলগুলোর প্রতিশোধের শিকার না হয়।

৪.স্থানীয় পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে অকার্যকর বা উদাসীন ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পাহাড়ে সংঘটিত প্রতিটি হত্যা ও অপহরণের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। থানাকে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার জায়গায় পরিণত করতে হবে। ৫.জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামসহ আন্তর্জাতিক মহলে পাহাড়ে সশস্ত্র দলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির প্রকৃত তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরতে হবে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চালানো তথ্যযুদ্ধকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভুল প্রমাণ করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই,সবুজের সমারোহে ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। এই পাহাড় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, আর এখানকার সাধারণ মানুষও কোনো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক নয়। পার্বত্য চুক্তির দীর্ঘ বছর পার হয়ে গেলেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি না আসার প্রধান অন্তরায় এই অবৈধ অস্ত্র ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির রাজনীতি।

পাহাড়ের রক্তাক্ত বাস্তবতা ঢেকে রাখার দিন শেষ। যদি এখনই এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ভূখণ্ডটি অচিরেই একটি স্থায়ী অপরাধমূলক জোনে পরিণত হবে, যা বাংলাদেশের সার্বিক জাতীয় অখণ্ডতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। পাহাড়ের সাধারণ নিরপরাধ মানুষ কেবল শান্তিতে ঘুমাতে চায়; তারা চাঁদাবাজির ভয় মুক্ত, অস্ত্রের শব্দহীন এক নতুন সকাল চায়।

সেই অধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। পাহাড়ে সবুজের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতেই হবে—এটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দাবি।