দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন এক ধর্ষণের শিকার নারী। বিচার পাওয়ার আশায় শুরু হওয়া সেই আইনি লড়াই আজও শেষ হয়নি। এদিকে ধর্ষণের ঘটনার পর জন্ম নেওয়া তার মেয়েও বড় হয়েছেন পিতৃপরিচয়হীন এক বাস্তবতায়। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিচারাধীন একটি ধর্ষণ মামলায় উঠে এসেছে অভিযুক্তের পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়। মামলার এজাহারে যার নাম রুহুল আমিন, পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি মো. সুমন নামে পরিচয় গ্রহণ করেছেন। তবে আদালতের নির্দেশে সম্পন্ন হওয়া ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের ঘটনায় জন্ম নেওয়া সন্তানের পিতা হিসেবে রুহুল আমিনের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। এরপরও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন কাটছে ভুক্তভোগী মা ও তার মেয়ের। মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর মরকুন টেকপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন পোশাকশ্রমিক আমেনা বেগম (ছদ্মনাম)। তার অভিযোগ, বাড়িওয়ালার ছেলে রুহুল আমিন তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস পর আমেনা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে গর্ভপাত করানোর জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে মামলার বাদীপক্ষ দাবি করে। তবে তিনি সন্তানকে জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সন্তানের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করা এবং ধর্ষণের বিচার চেয়ে তৎকালীন টঙ্গী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই সময় দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে মামলার এজাহারে অভিযুক্তের নাম রুহুল আমিন হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার আমেনা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, ২২ বছর ধরে শুধু আদালতে যাচ্ছি। কত বিচারক বদলেছেন, কত তারিখ গেছে, কিন্তু এখনো বিচার শেষ হয়নি। আমি শুধু আমার মেয়ের অধিকার আর ন্যায়বিচার চাই। এ বিষয়ে ধর্ষিতা আমেনা বেগমের মেয়ে সুরভী আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, জন্মের পর থেকে বাবার পরিচয় ছাড়া বড় হয়েছেন তিনি। বিদ্যালয়, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা পর্যায়ে তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন নথিপত্রে পিতার পরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতের সংসার জীবন নিয়েও তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কোনো অপরাধ করিনি। অথচ জন্মের পর থেকেই একটি পরিচয়ের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। আমার একটাই চাওয়া আদালত দ্রুত রায় দিক, আমি আমার ন্যায্য পরিচয় ফিরে পাই। মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম মো. সুমন হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে মামলার নথিতে থাকা নাম এবং এনআইডির নামের মধ্যে অমিল তৈরি হয়। এ বিষয়ে সরেজমিনে মরকুন টেকপাড়া এলাকায় গিয়ে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে তার মা নুরুন্নাহার এবং ছোট বোন মায়া আক্তার জানান, রুহুল আমিন ও মো. সুমন একই ব্যক্তি। এলাকায় সবাই জানে রুহুল আমিন কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র করেছে মো. সুমন নামে। মামলার দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে ২০১৭ সালে আদালতের নির্দেশে অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর মেয়ের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। একই বছরের ২৭ এপ্রিল প্রকাশিত ফরেনসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সুরভী আক্তারের (ছদ্মনাম) পিতা রুহুল আমিন। গাজীপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকিয়া আরিফ স্বর্ণা বলেন, ধর্ষণ একটি জামিন-অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষায় অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীর সন্তানের সম্পর্ক প্রমাণিত হলে আইনের বিধান অনুযায়ী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের মামলায় আপসের কোনো সুযোগ নেই। ডিএনএ রিপোর্ট যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কোনো আইনগত পথ নেই। এদিকে গাজীপুর পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার জানান, মামলার তদন্ত অনেক আগেই শেষ করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একটি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় শুধু একজন ধর্ষণের শিকার নারী নন, তার মেয়েও সামাজিক, মানসিক ও আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। ডিএনএ পরীক্ষায় জৈবিক সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়ার পরও বিচার শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার দ্রুত রায় এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
4:00 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :
২২ বছরেও শেষ হয়নি ধর্ষণ মামলার বিচার
-
MIT ERP
- Update Time : 02:31:23 am, Sunday, 2 August 2026
- 9
Tag :
Popular Post













