পুলিশের মাঠ পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালনে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। পেশাগত আচরণ, পোশাক পরিধানে নিয়ম-কানুন অমান্যের পাশাপাশি বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে পুলিশের কিছু সদস্যের চলাফেরায়। সম্প্রতি বিষয়টি নজরে আসার পর মাঠ পর্যায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ৩৬ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগে একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয় গত ১৬ মার্চ। সেই নির্দেশনা অমান্য করায় পুনরায় নির্দেশনা দিয়ে পুলিশের সব ইউনিট প্রধানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে পুলিশের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায়, মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা ঠিকভাবে পোশাক না পরেই দায়িত্ব পালন করেন। আবার আচরণবিধিও ঠিকমতো মানেন না। এতে বাহিনীর ভাবমূর্তিতে চরম সংকট তৈরি করে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাদা পোশাকে অভিযান বা অপারেশনাল কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার মুখে পড়েছে পুলিশ বাহিনী। উচ্চ আদালত থেকেও নির্দেশনা ছিল পোশাক ছাড়া পুলিশ কোনো অভিযানে অংশ নিতে পারবে না। এর কারণ ছিল, অনেক সময় সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান, রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো পেশার ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। ফলে উচ্চ আদালত ওই নির্দেশনা দিয়েছিল। এ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে যথাযথ নিয়ম মানা অথবা গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিষয়ে তার নিকট আত্মীয়স্বজনকে তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু এগুলো ঠিকভাবে মানা হয়নি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় পুলিশের শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি হয়ে পড়ায় এসব নির্দেশনা নতুন করে আবারও দেওয়া হয়েছে। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পুলিশ বাহিনী একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিছু কর্মকর্তা বা সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুরো বাহিনী নেবে না। সময়ে সময়ে কিছু সদস্যকে দেখা যায় ড্রেস রুলস না মেনে দায়িত্ব পালন করেন। অনেক সময় অভিযান পরিচালনায় পোশাক না পরে অভিযানে যান। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন সময়ে শৃঙ্খলা মানার নির্দেশনা দেওয়া হলেও সম্প্রতি সেসব নির্দেশনা অমান্য করার বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ফলে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী কমকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। শৃঙ্খলা না ফিরলে অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কোনো চেইন অব কমান্ড থাকবে না। সূত্র জানিয়েছে, গত ২৭ জুলাই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট-প্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ পেশাদার ও জনসেবামূলক বাহিনী। বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা, কর্মনিষ্ঠা, কর্মস্থলে আচরণ ও পেশাগত শৃঙ্খলা পুলিশের ভাবমূর্তি, কমান্ড কাঠামো, প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। সম্প্রতি পুলিশে কর্মরত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ড্রেস রুলস যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, অফিসিয়াল পোশাক পরিধানে শৈথিল্য (অবহেলা), অফিস চলাকালীন অননুমোদিত পেশাক ব্যবহার, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং অফিস পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যত্যয় লক্ষ করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পুলিশ ড্রেস রুলস ২০২৫, পুলিশ রেগুলেশনস (পিআরবি) ১১৪৩, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এবং পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স কর্তৃক সময়ে সময়ে জারিকৃত নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যদের ড্রেস রুলস, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের আচরণ এবং পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করে নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। চিঠিতে ৩৬ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অফিস চলাকালীন পুলিশ ও নন-পুলিশ সদস্যকে নির্ধারিত অফিসিয়াল পোশাক বা ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। অফিস-পরবর্তী সময়েও মার্জিত ও পরিশীলিত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করতে হবে। গাড়িচালক, অফিস আরদালি, গানম্যানসহ ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যকে অফিস চলাকালীন পুলিশ ড্রেস রুলস-২০২৫-এর সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি ইউনিফর্ম যথাযথ নিয়ম অনুসারে পরিধান করতে হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউনিফর্মের সব অংশ (প্রাধিকার অনুযায়ী যথাযথ ক্যাপ বা ব্যারেট ক্যাপ, বেল্ট, বুট, জুতা, মোজা, র্যাংক ব্যাজ, নেমপ্লেট, হ্যাঙিং ব্যাজ, আইডি কার্ড, ল্যানিয়ার্ড, বাঁশি, মনোগ্রাম, ডিপসাইন ইত্যাদি) বিধি অনুযায়ী পরিধান করতে হবে। বিধিবহির্ভূত রং, ডিজাইন অথবা অস্পষ্ট লেখাযুক্ত ভাঙা, ক্ষতিগ্রস্ত, বিবর্ণ বা অপরিচ্ছন্ন, পুরাতন নেমপ্লেট, র্যাংক ব্যাজ ও অন্যান্য ইউনিফর্ম সামগ্রী পরিধান থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে বুটের পরিবর্তে অননুমোদিত জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করা যাবে না। ইউনিফর্ম ব্যক্তিগত পছন্দ, ফ্যাশন বা সুবিধার কথা বিবেচনা করে ইচ্ছামতো পরিবর্তন, টেইলারিং, সংকুচিত যা প্রসারিত করা যাবে না। অনুমোদনহীন অলংকার, ব্যাজ, পিন, ব্রেসলেট, চেইন, স্টিকার, প্রতীক, লোগো বা অন্য কোনো সামগ্রী ইউনিফর্মের সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে না। অফিস চলাকালীন ইউনিফর্মধারী নারী পুলিশ সদস্য বিধিবহির্ভূতভাবে থ্রি-কোয়ার্টার হাতার ইউনিফর্ম পরিধান, অননুমোদিত রং ও ডিজাইনের হিজাব বা ওড়না ব্যবহার, নির্ধারিত ড্রেস রুলসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চুলের সজ্জা, অলংকার ও প্রসাধন ব্যবহার অথবা অপরিশীলিত সাজগোজ ও মেকাপ করা থেকে বিরত থাকবেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আয়রন করা ও পরিপাটি ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। চুল, দাঁড়ি, গোঁফ বিধি মোতাবেক নিয়মিত ট্রিমিং করতে হবে। দাঁড়ি বা গোঁফ রাখার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী যথাযথ অনুমোদন নিতে হবে। বাহিনীর চেইন অব কমান্ড সমুন্নত রাখার স্বার্থে সর্বাবস্থায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, স্যালুটিং, রিপোর্টিং ও অফিসিয়াল প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যেকোনো দাপ্তরিক সাক্ষাতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ও পূর্ণাঙ্গ ইউনিফর্ম পরিধান করে উপস্থিত হতে হবে। একই সঙ্গে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য প্রদানের সময় যথাযথ নির্দেশনা অনুসরণের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ইউনিফর্মে হাজির হতে হবে। অফিসে উপস্থিতির সময় সরকারি পরিচয়পত্র দৃশ্যমানভাবে বহন করতে হবে। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় ধূমপান, ই-সিগারেট, পান-সুপারি, জর্দা, গুল, তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার, উচ্চ স্বরে হাসি-তামাশা, অশোভন আচরণ অথবা বাহিনীর মর্যাদাহানিকর কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া যাবে না। অফিস সময় যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রিন্টার ও অন্যান্য সরকারি সম্পদ কেবল সরকারি কাজে ব্যবহার করতে হবে। সহকর্মী, অধস্তন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সর্বদা ভদ্র, সৌজন্যমূলক ও পেশাদার আচরণ করতে হবে। অফিস চলাকালীন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিগত প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা যাবে না। ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় সামাজিক মাধ্যমে লাইভ, রিলস, টিকটক বা বাহিনীর মর্যাদা পরিপন্থি কোনো কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স প্রদত্ত নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সরকারি নথি, ডি-নথি, কম্পিউটার, ই-মেইল ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সরকারি তথ্য, নথি বা ছবি ধারণ, সংরক্ষণ, প্রচার বা শেয়ার করা যাবে না। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সরকারি সম্পদ ব্যবহার কেবল প্রচলিত বিধি ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে করা যাবে। চিঠির আদেশের শেষাংশে বলা হয়েছে, প্রত্যেক তদারককারী কর্মকর্তা নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন সদস্যদের শৃঙ্খলা, ড্রেস রুলস প্রতিপালন ও কর্মস্থলের আচরণের জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন। সব ইউনিট-প্রধান, শাখাপ্রধান, তদারককারী কর্মকর্তা নির্দেশনাসমূহ অধিনস্ত সব সদস্যকে কল্যাণসভা, নিয়মিত রোলকল এবং ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে অবগত করবেন এবং আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। নির্দেশনার ব্যত্যয় চোখে পড়লে প্রচলিত আইন ও বিধি বিভাগীয় শৃঙ্খলা বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনার বিষয়ে নোয়াখালী জেলার এসপি এইচ এম নাসিরুদ্দিন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের ড্রেস রুলসসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি নোয়াখালীতে যোগদানের পরপরই রুলকল, কল্যাণসভাসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মিটিংগুলোতে জেলার সব থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা মোতাবেক চলার নির্দেশনা দিয়েছেন। ঠিকভাবে পোশাক পরে ডিউটি করা, আচরণে সুশৃঙ্খল থাকা, সময় মেনে ডিউটি পালন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার মতো দেশের অন্যান্য জেলা পুলিশ সুপারও নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। একইভাবে রেঞ্জ ডিআইজি, বিভিন্ন ইউনিট-প্রধানদের মাধ্যমে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসবের ব্যত্যয় হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
2:56 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা মানছেন না মাঠের কর্মকর্তারা
-
MIT ERP
- Update Time : 01:52:26 am, Sunday, 2 August 2026
- 3
Tag :
Popular Post












