বিশ্ববাণিজ্যের নানামুখী চ্যালেঞ্জ আর বৈশ্বিক মন্দার মেঘ কাটিয়ে নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙার নতুন লড়াইয়ে নেমেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। চলতি অর্থবছরে রেকর্ড ৩৬ লাখ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের এক সুনির্দিষ্ট টার্গেট নিয়েছে দেশের প্রধান এই সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনে, বেসরকারি অফ-ডক, শিপিং এজেন্ট ও কাস্টমসসহ সব পক্ষকে এক ছন্দে কাজ করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই লক্ষ্য শুধুই একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতির এক শক্ত বার্তা। সমুদ্রের নীল সীমানায় ভিড় জমানো বিশালাকার জাহাজ থেকে শুরু করে ইয়ার্ডের টার্মিনাল সবখানেই এখন নতুন রেকর্ডের প্রস্তুতি। বন্দরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলে আঞ্চলিক শিপিং রুটে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন শক্ত হবে, তেমনই গতি পাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। তথ্যসূত্র মতে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৭৬০ টিইইউএস বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউ হ্যান্ডলিং করে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে এই বন্দর। এবার সেই সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে চলতি অর্থবছরে ৩৬ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের তথ্য মতে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১১ কোটি ৮১ লাখ ৭৪ হাজার ১৬০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৩২ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৮ মেট্রিক টন, ১০২৪-২৫ সালে ১৩ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (সাময়িক) ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন। পাশাপাশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে সমান গতিতে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৮ টিইইএস। ২০২২-২৩ সালে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৩৭৫ , ২০২৩-২৪ সালে ৩১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯০, ২০২৪-২৫ সালে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে (সাময়িক) ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইউএস। একই সময়ে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে জাহাজ আগমনের সংখ্যা। ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ এসেছিল ৪ হাজার ২৩১টি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২২-২৩ সালে ৪ হাজার ২৫৩টি, ২০২৪-২৫ সালে ৪ হাজার ৭৭টি এবং ২০২৫-২৬ সালে জাহাজ এসেছে (সাময়িক) ৪ হাজার ৩৩৬টি। বন্দর সূত্র জানায়, বন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ইয়ার্ডে অকশনকৃত মালামালগুলোই সক্ষমতার সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ নানা জটিলতায় ইয়ার্ডে পড়ে থাকা কনটেইনার সরানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইয়ার্ডের অভ্যন্তরে থাকা ১০ হাজার টিইউএস কনটেইনার সরিয়ে নবনির্মিত তালতলা ইয়ার্ডে স্থানান্তর করা হবে। ক্রমান্বয়ে আরও কনটেইনার বিভিন্ন ইয়ার্ডে সরানো হবে। এতে করে বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনার ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, এমনটাই মনে করছেন বন্দরের কর্তাব্যক্তিরা। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে ইয়ার্ডে মধ্যমমানের কিছু যন্ত্রপাতি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত অন্য যন্ত্রপাতিগুলোকে সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক বন্দরবিষয়ক পরিচালক মাহমুদুল হক শাহ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের যে পরিমাণ আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ জনবল আছে, তা দিয়ে বছরে এখনো ৪০ থেকে ৫০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার অনায়াসে হ্যান্ডলিং করতে পারবে। বন্দরের সাথে সম্পর্কিত কাস্টমস, শিপিং এজেন্টস সিএন্ডএফ এজেন্টসহ এক ডজনের মতো বিভিন্ন সংস্থা জড়িত। সেসব সংস্থাকে যদি এক ছাতার নিচে এনে কাজের সমন্বয় করা যায়, তবে বন্দরের সক্ষমতা আর বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশ্বের উন্নত বন্দর কীভাবে পরিচালিত হয়, চট্টগ্রাম বন্দর তাদের অনুসরণ করতে পারে, এমনটিই মনে করেন মাহমুদুল হক শাহ। চবকের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও আধুনিকায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করেছেন। সে অনুযায়ী বন্দরের আধুনিকায়ন ও কনটেইনার পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধিতে কৌশলগত রোডম্যাপ বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে অধিকতর ডিজিটালাইজেশন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত শুল্কায়ন, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ, জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় কাক্সিক্ষত মাত্রায় আনা, ব্যবসাবান্ধব পরিচালনব্যবস্থা এবং নির্বিঘ সামুদ্রিক লজিস্টিক সরবরাহ নিশ্চিত করা অন্যতম। কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ আরও বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড়া ৩৫ লাখ কনটেইনারের রেকর্ড শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি, শিল্পের প্রসার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রতীক। সেই অর্জনের ওপর ভর করেই চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন অঙ্গীকার ৩৬ লাখ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য শুধু আরেকটি রেকর্ড নয়; লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দক্ষ, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক সমুদ্রবন্দরে পরিণত হওয়া।
4:11 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :
৩৫ লাখের গর্ব, ৩৬ লাখের অঙ্গীকার চবকের
-
MIT ERP
- Update Time : 02:46:31 am, Sunday, 2 August 2026
- 4
Tag :
Popular Post















