ছুটি কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় শেষ। ব্যাগ গুছানো, রিটার্ন টিকিটও কাটা। আবার কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি। কিন্তু বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে কিংবা অনলাইনে ভিসার স্ট্যাটাস যাচাই করতেই মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে মাত্র একটি শব্দ, ক্যানসেল। কোনো পূর্বঘোষণা নেই, নেই কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ। হঠাৎ করেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশিদের বৈধ কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এই কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ। চাকরি হারানোর শঙ্কা, দেশে আটকে পড়ার আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো প্রবাসী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই থেকে ভিসা অটো ক্যানসেল শুরু হয়। ছুটিতে দেশে আসা কিংবা আমিরাতে অবস্থানরত বহু বাংলাদেশি কর্মীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। কোম্পানির লাইসেন্স বৈধ, চাকরি বহাল এবং ভিসার মেয়াদ অবশিষ্ট থাকা সত্ত্বেও অনেকের ভিসা হঠাৎ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে কেউ বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ফিরে আসছেন। আবার কেউ বিমানে ওঠার আগেই জানতে পারছেন, তার ভিসা আর কার্যকর নেই। ভুক্তভোগী আবদুল আলিম মাসুদ জানান, গত এপ্রিলে চার মাসের ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। আগামী ৩১ জুলাই আমিরাতে ফেরার জন্য টিকিটও কেটে ফেলেন। কিন্তু যাত্রার আগে ভিসা যাচাই করতে গিয়ে দেখেন, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। শুধু আব্দুল আলিম মাসুদই নন, মোহাম্মদ ফিরোজ, মো. সাইদ উদ্দিন, খান তামিমসহ অসংখ্য আমিরাতপ্রবাসী দেশে এসেছিলেন ছুটি কাটাতে। ভিসার মেয়াদ থাকলেও তাদের ভিসা ক্যানসেল দেখাচ্ছে। যে কারণে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। মোহাম্মদ ফিরোজের মতে, তার ভিসার মেয়াদ তিন মাসের বেশি ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই এটি বাতিল হয়েছে। এখন কী হবে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। বাংলাদেশ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তিনি। শুধু মাসুদ নন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রবাসী ফোরামেও একই অভিযোগ করছেন অসংখ্য বাংলাদেশি। এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামানের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বহু লোকের ভিসা ক্যানসেল হয়েছে। কতজনের ভিসা ক্যানসেল হয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান এখনো সংশ্লিষ্টরা দিতে পারেননি। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তারা জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া বা কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে ভিসা বাতিল হতে পারে। বিশেষ করে পর্যটন, হোটেল ও সেবা খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মী সংকোচনের খবর মিলেছে। আরেকটি কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে আমিরাতের প্রচলিত আইন। সেখানে টানা ১৮০ দিনের বেশি দেশের বাইরে অবস্থান করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভিসা বাতিল হতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাদের ছুটি বৈধ ছিল, চাকরিও বহাল ছিল, তাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। ফলে এটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি অন্য কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ফল- এ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কয়েকটি খাতে ব্যাবসায়িক মুনাফা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অনেক কোম্পানি কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনছে। এর প্রভাবও ভিসা বাতিলের ঘটনায় প্রতিফলিত হতে পারে। যদিও এসব বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। আবুধাবিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও দুবাই কনস্যুলেট যৌথভাবে আমিরাতের পররাষ্ট্র ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশিদের নয়, পাকিস্তান ও নেপালের কর্মীরাও একই সংকটে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমিরাতের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে সময় চাওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চলছে।’ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১ হাজার ৪০০-এর বেশি প্রবাসীর তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে দূতাবাস। বিশেষ করে ভিসা পুনর্বহাল করে দেওয়ার নামে কোনো প্রতারক চক্র যাতে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারি সূত্র ছাড়া অন্য কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভিসা জটিলতার মধ্যেই নতুন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে বিমানভাড়া। কয়েক সপ্তাহ আগেও ঢাকা-আমিরাত রুটে যেখানে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত। এখন একই রুটে ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ও অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাই দুবাই, এমিরেটস এবং কয়েকটি দেশীয় এয়ারলাইনসের টিকিট বর্তমানে ১ লাখ ১৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একদিকে ভিসা বাতিলের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া বিমানভাড়া তাদের চরম বিপাকে ফেলেছে। প্রবাসীদের দাবি, ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণ দ্রুত উদঘাটন, চাকরি সুরক্ষা এবং অস্বাভাবিক বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
5:10 am, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :












