পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মোকাবিলায় সামরিক অভিযান জোরদার করছে দেশটির সরকার, অন্যদিকে এসব অভিযানের সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি শান্তিতে রূপ না নেওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ, সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনগণের আস্থা অর্জনও জরুরি। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বেলুচিস্তানে ১ হাজার ১৪৭টি সন্ত্রাসী হামলায় ২ হাজার ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪২৪ জন বেসামরিক নাগরিক, ৭৩৬ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ১ হাজার ২৩৩ জন বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী।
একজনের মৃত্যুর শ্রেণি নির্ধারণ করা যায়নি। এসব পরিসংখ্যান প্রদেশটির ভয়াবহ নিরাপত্তা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল খাইবার পাখতুনখোয়া। কিন্তু চলতি বছর বেলুচিস্তানে হামলা ও প্রাণহানির মাত্রা পরিস্থিতির নতুন মাত্রা তুলে ধরেছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার ৩৬টি জেলার মধ্যে ১২টিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ায় সেখানে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানে সাফল্য, তবু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’ কর্মসূচির অধীনে বেলুচিস্তানে অভিযান জোরদার করেছে। সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখার তথ্য অনুযায়ী, গোয়াদর জেলার শাদি কৌর ও পাসনি এবং কালাত জেলার জাট্টাকাবাদ এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে চারজন সশস্ত্র সদস্য নিহত হন।
তবে অভিযানের সময় পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে সেনাবাহিনীর মেজর ওয়াজাহাত ওয়াহিদ প্রাণ হারান। তার বয়স ছিল ৩৪ বছর এবং বাড়ি লাহোরে। সামরিক বাহিনীর দাবি, অভিযানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকায় অন্য সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা জানতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তান সরকার কয়েকটি বেলুচিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীকে ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ নামে অভিহিত করে এবং দেশটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ভারতের ভূমিকার অভিযোগ তোলে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভিযান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ না থাকলে গোষ্ঠীগুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। অতীতে হামলা কমে যাওয়াকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষণ হিসেবে দেখা হলেও পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ফিরে এসেছে।
তাই সাময়িক সাফল্যকে স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সন্ত্রাসবাদের পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সংকট : খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসবাদের শিকড় দীর্ঘদিনের। ১৯৯৪ সালের মে মাসে সুফি মুহাম্মদের নেতৃত্বে তেহরিক-ই-নিফাজ-ই-শরিয়ত-ই-মুহাম্মদীর মালাকান্দ আন্দোলনকে এ অঞ্চলে আধুনিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন নিয়ে বিরোধী দমনের অভিযোগ : পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে। ১৯৯৭ সালে প্রণীত আইনটি দ্রুত বিচার এবং সন্ত্রাসী কর্মকা- মোকাবিলার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল। আমলাদের দেশত্যাগ নিয়ে উদ্বেগ : পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
তার অভিযোগ, অনেক আমলা চাকরিতে থাকা অবস্থাতেই কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি এ ঘটনাকে ‘আমলাতান্ত্রিক দেশত্যাগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। খাজা আসিফের দাবি, বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনাকারী কর্মকর্তাদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
তাদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কেন জরুরি, জানাল যুক্তরাষ্ট্র : এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তার বক্তব্য, মতপার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি।






















