আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২৪%

নির্মাণ খাতে চাঁদাবাজিতে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার স্টাইলের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:50:21 pm, Friday, 2 October 2026
  • 12

নির্মাণ খাতে চাঁদাবাজিতে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার স্টাইলের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা নেওয়া কিংবা ঠিকাদারের অফিসে কাফনের কাপড় বা বুলেট পাঠিয়ে সরাসরি হুমকি দেওয়া, মোবাইলে ফোন করা বা চিরকুট পাঠানোর দিন শেষ। অপরাধ জগতে নির্মাণ খাতের চাঁদাবাজিতে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার স্টাইলের এক অভিনব ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।

রাজধানীর বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বা মেগা প্রজেক্টের নির্মাণাধীন অনেক ভবনে এখন আর দলবল নিয়ে কেউ হানা দিচ্ছে না। অপরাধীরা সম্পূর্ণ নীরবে দিনের আলোয় প্রজেক্টে এসে রডের গায়ে বিশেষ রঙের সুতায় গাঁথা ‘কোডেড স্টিকার’ বা ‘টোকেন’ লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা রাতের আঁধারে সাইটের সীমানায় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ রঙের ‘প্লাস্টিক সুতা’।

অপরাধ জগতের এই নতুন ‘ভিজ্যুয়াল কোড’ বা প্রতীকী পদ্ধতি এখন আবাসন খাতের জন্য আতঙ্ক। পুলিশ এবং রাজধানীর কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এই রঙিন সুতা বা টোকেনের অর্থ রংভেদে একেক রকম। কোনো রঙের অর্থ ওই প্রজেক্ট থেকে নির্দিষ্ট আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং বা সিন্ডিকেটের কাছে চাঁদা পৌঁছে গেছে এবং সাইটটি এখন তাদের ‘সুরক্ষায়’ আছে।

আবার কোনো রঙের অর্থ দ্রুত টাকা পৌঁছে দিতে হবে, নইলে খারাপি আছে। টাকা না দিলে সেখান থেকে গায়েব হয়ে যাবে টনকে টন রড, সিমেন্টের বস্তা। অথবা মারধরের শিকার হবে দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরী ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। রাজধানীর একাধিক আবাসন প্রকল্প ঘুরে এবং ভুক্তভোগী ডেভেলপার ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এই ‘নিঃশব্দ চাঁদাবাজি’র তথ্য জানা গেছে।

এই রঙিন সুতার পেছনে আরও অনেক অর্থ আছে। অপরাধীরা বার্তাভেদে লাল, নীল ও হলুদ রঙের সুতা বা টোকেন ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সবুজ সুতা বা টোকেনের অর্থ হলো, প্রজেক্টটি আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে অন্য কোনো ছোটখাটো গ্রুপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অন্যদিকে নীল বা হলুদ সুতাগুলো সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক কিশোর গ্যাং বা মাঝারি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের প্রতীক, যাদের মাসিক বা কিস্তিভিত্তিক টাকা দিতে হয়।

আর লাল সুতার অর্থ হলো, টাকা পৌঁছে দিতে হবে, অন্যথায় কপালে ভোগান্তি রয়েছে। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ঠিকাদার সোহেল রানা বলেন, পাইলিংয়ের কাজ শেষ করার পর একদিন সকালে প্রজেক্টের মূল ফটকে একটি বিশেষ রঙের প্লাস্টিক সুতা ও ক্যাশ মেমোর মতো একটি চিরকুট পান। কাগজে কোনো নাম ছিল না, শুধু একটি ভারতীয় মোবাইল নম্বর আর একটি সংখ্যা লেখা ছিল, ‘৫,০০,০০০’।

ওই হোয়াটসঅ্যাপযুক্ত ওই নম্বরে তাকে ফোন করতে বলা হয়। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি তিনি। কিন্তু এর ঠিক তিন দিন পর রাতের আঁধারে সাইটের সিকিউরিটি গার্ডকে বেঁধে মারধর করা হয় এবং প্রায় সাড়ে তিন টন রড ট্রাকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার পরদিন তিনি ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বাধ্য হলে ওপাশ থেকে ঠান্ডা গলায় বলা হয়, ‘ভাই, লাল সুতা লাগানো ছিল, খেয়াল করেন নাই?

টাকা দ্যান, সবুজ সুতা পাঠাচ্ছি, সময়মতো কাজ সারেন। ’ তিনি পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করার পর ওই গ্যাংয়ের লোক এসে সাইটের চার কোণায় সবুজ সুতা বেঁধে দিয়ে যায়। ভুক্তভোগী সোহেল রানা আরও বলেন, ‘‘তারা হুমকি দিয়েছিল— পুলিশকে জানালে প্রজেক্টের কাজ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই রড চুরি যাওয়ার চেয়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে গ্রিন সিগন্যাল বা ‘সবুজ সুতা’র নিরাপত্তা কেনা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

’’ এই চাঁদাবাজির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এতে কোনো দৃশ্যমান সহিংসতা বা তাৎক্ষণিক আইনি প্রমাণ থাকে না। ঠিকাদারেরা ভয়ে পুলিশের কাছে মুখ খোলেন না। কারণ, সুতা বেঁধে রাখা বা স্টিকার লাগানো কোনো প্রচলিত ফৌজদারি অপরাধের আওতায় সরাসরি পড়ে না। লালবাগ-হাজারীবাগ এলাকার কয়েকজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের দাবি, মালামাল চুরি ঠেকাতে তারা বাধ্য হয়েই এই প্রতীকী চাঁদাবাজি মেনে নিচ্ছেন।

কাঁচামালের দাম বাড়ার এই সংকটকালে প্রতি রাতে লাখ টাকার রড-সিমেন্ট চুরি হয়ে যাওয়ার চেয়ে অপরাধীদের ‘টোকেন’ কিনে নেওয়াকে তারা ‘নিরাপদ’ মনে করছেন। মিরপুরের একটি প্রজেক্টে কর্মরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাজী শফিকুল ইসলাম সাজু নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘‘আগে মাস্তানেরা দলবল নিয়ে আসত, সাইটের মানুষ দেখলেই চিনত।

এখন দুপুরবেলা সাধারণ পোশাকের কেউ এসে রডের বান্ডিলে একটি ভারতীয় মোবাইল নম্বর ও টাকার অঙ্কযুক্ত স্টিকার বেঁধে চলে যায়। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কিন্তু রাতে যখন লেবাররা কাজ করতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ওদের কাছ থেকেই জানলাম, এটা কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংয়ের ‘ট্যাক্স টোকেন’। এই টোকেন থাকলে কোনো সাপ্লাইয়ার আমাদের সাইটে বালু বা ইট আনলোড করতেও রাজি হয় না।

পরে বাধ্য হয়ে টোকেনের নির্দেশনামতো টাকা দিয়ে মালামাল আনা হয়। ’’ আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের নেতা ও আবাসন বিশ্লেষক প্রকৌশলী লিয়াকত আলী ভূঁইয়া এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘‘নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে আবাসন খাত এমনিতেই ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে।

এর ওপর এই নতুন ঘরানার ‘প্রতীকী চাঁদাবাজি’ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। রড-সিমেন্ট চুরির বা প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ডেভেলপাররা মুখ বুজে এই টাকা দিচ্ছেন। প্রজেক্টপ্রতি এই যে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত অদৃশ্য খরচ হচ্ছে, তা কিন্তু কোনো অ্যাকাউন্টে দেখানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের নির্মাণব্যয় বাড়িয়ে হিসাব করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত এই জিম্মিদশার পুরো মাশুল দিতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের, যা আবাসন বাজারকে আরও সংকুচিত করছে। ’’ ঠিকাদারি ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি বাংলাদেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, যা প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে বাধা সৃষ্টি করে। সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, কিশোর গ্যাং, পাতিনেতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

নির্মাণ খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের মালিক আজমল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, তাদের খাতের চাঁদাবাজি সাধারণত কয়েকটি উপায়ে হয়ে থাকে। কাজ শুরু করার আগে বা কাজ চলাকালে নির্দিষ্ট অঙ্কের মোটা টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। স্থানীয় সিন্ডিকেট বা চাঁদাবাজেরা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে নিম্নমানের ইট, বালু, রড বা সিমেন্ট কিনতে ঠিকাদারদের বাধ্য করে।

এ ছাড়া নিজস্ব লোকজনকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য করা ও তাদের জন্য অতিরিক্ত মজুরি দাবি করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এই চাঁদাবাজির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। চাঁদার টাকা ও সিন্ডিকেটের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অতিরিক্ত খরচের কারণে ঠিকাদারেরা লাভ টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় রড, সিমেন্ট বা অন্যান্য উপকরণের গুণগত মান কমিয়ে দেন।

ক্রমাগত চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তার অভাবে দেশি-বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। ’ সাবেক উপদেষ্টা, অপরাধ গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাখাওয়াত হোসেন বিষয়টিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক রূপান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘অপরাধীরা এখন অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে চলে।

তারা জানে যে সরাসরি অস্ত্র উঁচিয়ে চাঁদাবাজি করলে বা গোলাগুলি করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র তাড়া খাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং গণমাধ্যমে দ্রুত আলোড়ন তৈরি হয়। তাই তারা মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেল কিংবা জাপানিজ ইয়াকুজাদের মতো ‘করপোরেট অপরাধ মডেল’ বা মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শনের কৌশল বেছে নিয়েছে। এই সুতা বা ভিজ্যুয়াল কোড হলো এক ধরনের ‘সাইলেন্ট টেরর’ বা নিঃশব্দ সন্ত্রাস।

অপরাধীরা সহিংসতার ঝুঁকি ছাড়াই কোটি কোটি টাকা তুলছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত অ্যালার্মিং। এটি প্রমাণ করে যে মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী এবং তারা পুরো ব্যবস্থার গলদগুলো খুব ভালো করে জানে। ’’ এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে।

এই সুতা বা টোকেন কালচারটি আমাদের নজরে এসেছে। তবে বড় সমস্যা হলো, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বা ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাচ্ছি না। তারা চুরির মামলা বা জিডি করেন, কিন্তু চাঁদাবাজির মূল বিষয়টি গোপন রাখেন। চাঁদাবাজি নিয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছি। আমরা ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করছি, তারা যদি গোপনে আমাদের তথ্য দেন বা ৯৯৯-এ ফোন করে বলেন, তবে বিশেষ দল পাঠিয়ে এই নিঃশব্দ সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলব।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আসামি হিসেবেই দেশে ফিরতে হবে: ডা. শাহাদাত

নির্মাণ খাতে চাঁদাবাজিতে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার স্টাইলের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

Update Time : 10:50:21 pm, Friday, 2 October 2026

অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা নেওয়া কিংবা ঠিকাদারের অফিসে কাফনের কাপড় বা বুলেট পাঠিয়ে সরাসরি হুমকি দেওয়া, মোবাইলে ফোন করা বা চিরকুট পাঠানোর দিন শেষ। অপরাধ জগতে নির্মাণ খাতের চাঁদাবাজিতে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার স্টাইলের এক অভিনব ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।

রাজধানীর বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বা মেগা প্রজেক্টের নির্মাণাধীন অনেক ভবনে এখন আর দলবল নিয়ে কেউ হানা দিচ্ছে না। অপরাধীরা সম্পূর্ণ নীরবে দিনের আলোয় প্রজেক্টে এসে রডের গায়ে বিশেষ রঙের সুতায় গাঁথা ‘কোডেড স্টিকার’ বা ‘টোকেন’ লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা রাতের আঁধারে সাইটের সীমানায় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ রঙের ‘প্লাস্টিক সুতা’।

অপরাধ জগতের এই নতুন ‘ভিজ্যুয়াল কোড’ বা প্রতীকী পদ্ধতি এখন আবাসন খাতের জন্য আতঙ্ক। পুলিশ এবং রাজধানীর কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এই রঙিন সুতা বা টোকেনের অর্থ রংভেদে একেক রকম। কোনো রঙের অর্থ ওই প্রজেক্ট থেকে নির্দিষ্ট আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং বা সিন্ডিকেটের কাছে চাঁদা পৌঁছে গেছে এবং সাইটটি এখন তাদের ‘সুরক্ষায়’ আছে।

আবার কোনো রঙের অর্থ দ্রুত টাকা পৌঁছে দিতে হবে, নইলে খারাপি আছে। টাকা না দিলে সেখান থেকে গায়েব হয়ে যাবে টনকে টন রড, সিমেন্টের বস্তা। অথবা মারধরের শিকার হবে দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরী ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। রাজধানীর একাধিক আবাসন প্রকল্প ঘুরে এবং ভুক্তভোগী ডেভেলপার ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এই ‘নিঃশব্দ চাঁদাবাজি’র তথ্য জানা গেছে।

এই রঙিন সুতার পেছনে আরও অনেক অর্থ আছে। অপরাধীরা বার্তাভেদে লাল, নীল ও হলুদ রঙের সুতা বা টোকেন ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সবুজ সুতা বা টোকেনের অর্থ হলো, প্রজেক্টটি আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে অন্য কোনো ছোটখাটো গ্রুপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অন্যদিকে নীল বা হলুদ সুতাগুলো সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক কিশোর গ্যাং বা মাঝারি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের প্রতীক, যাদের মাসিক বা কিস্তিভিত্তিক টাকা দিতে হয়।

আর লাল সুতার অর্থ হলো, টাকা পৌঁছে দিতে হবে, অন্যথায় কপালে ভোগান্তি রয়েছে। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ঠিকাদার সোহেল রানা বলেন, পাইলিংয়ের কাজ শেষ করার পর একদিন সকালে প্রজেক্টের মূল ফটকে একটি বিশেষ রঙের প্লাস্টিক সুতা ও ক্যাশ মেমোর মতো একটি চিরকুট পান। কাগজে কোনো নাম ছিল না, শুধু একটি ভারতীয় মোবাইল নম্বর আর একটি সংখ্যা লেখা ছিল, ‘৫,০০,০০০’।

ওই হোয়াটসঅ্যাপযুক্ত ওই নম্বরে তাকে ফোন করতে বলা হয়। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি তিনি। কিন্তু এর ঠিক তিন দিন পর রাতের আঁধারে সাইটের সিকিউরিটি গার্ডকে বেঁধে মারধর করা হয় এবং প্রায় সাড়ে তিন টন রড ট্রাকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার পরদিন তিনি ওই মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বাধ্য হলে ওপাশ থেকে ঠান্ডা গলায় বলা হয়, ‘ভাই, লাল সুতা লাগানো ছিল, খেয়াল করেন নাই?

টাকা দ্যান, সবুজ সুতা পাঠাচ্ছি, সময়মতো কাজ সারেন। ’ তিনি পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করার পর ওই গ্যাংয়ের লোক এসে সাইটের চার কোণায় সবুজ সুতা বেঁধে দিয়ে যায়। ভুক্তভোগী সোহেল রানা আরও বলেন, ‘‘তারা হুমকি দিয়েছিল— পুলিশকে জানালে প্রজেক্টের কাজ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই রড চুরি যাওয়ার চেয়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে গ্রিন সিগন্যাল বা ‘সবুজ সুতা’র নিরাপত্তা কেনা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

’’ এই চাঁদাবাজির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এতে কোনো দৃশ্যমান সহিংসতা বা তাৎক্ষণিক আইনি প্রমাণ থাকে না। ঠিকাদারেরা ভয়ে পুলিশের কাছে মুখ খোলেন না। কারণ, সুতা বেঁধে রাখা বা স্টিকার লাগানো কোনো প্রচলিত ফৌজদারি অপরাধের আওতায় সরাসরি পড়ে না। লালবাগ-হাজারীবাগ এলাকার কয়েকজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের দাবি, মালামাল চুরি ঠেকাতে তারা বাধ্য হয়েই এই প্রতীকী চাঁদাবাজি মেনে নিচ্ছেন।

কাঁচামালের দাম বাড়ার এই সংকটকালে প্রতি রাতে লাখ টাকার রড-সিমেন্ট চুরি হয়ে যাওয়ার চেয়ে অপরাধীদের ‘টোকেন’ কিনে নেওয়াকে তারা ‘নিরাপদ’ মনে করছেন। মিরপুরের একটি প্রজেক্টে কর্মরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাজী শফিকুল ইসলাম সাজু নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘‘আগে মাস্তানেরা দলবল নিয়ে আসত, সাইটের মানুষ দেখলেই চিনত।

এখন দুপুরবেলা সাধারণ পোশাকের কেউ এসে রডের বান্ডিলে একটি ভারতীয় মোবাইল নম্বর ও টাকার অঙ্কযুক্ত স্টিকার বেঁধে চলে যায়। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কিন্তু রাতে যখন লেবাররা কাজ করতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ওদের কাছ থেকেই জানলাম, এটা কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংয়ের ‘ট্যাক্স টোকেন’। এই টোকেন থাকলে কোনো সাপ্লাইয়ার আমাদের সাইটে বালু বা ইট আনলোড করতেও রাজি হয় না।

পরে বাধ্য হয়ে টোকেনের নির্দেশনামতো টাকা দিয়ে মালামাল আনা হয়। ’’ আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের নেতা ও আবাসন বিশ্লেষক প্রকৌশলী লিয়াকত আলী ভূঁইয়া এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ‘‘নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে আবাসন খাত এমনিতেই ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে।

এর ওপর এই নতুন ঘরানার ‘প্রতীকী চাঁদাবাজি’ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। রড-সিমেন্ট চুরির বা প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ডেভেলপাররা মুখ বুজে এই টাকা দিচ্ছেন। প্রজেক্টপ্রতি এই যে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত অদৃশ্য খরচ হচ্ছে, তা কিন্তু কোনো অ্যাকাউন্টে দেখানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের নির্মাণব্যয় বাড়িয়ে হিসাব করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত এই জিম্মিদশার পুরো মাশুল দিতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের, যা আবাসন বাজারকে আরও সংকুচিত করছে। ’’ ঠিকাদারি ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি বাংলাদেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, যা প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে বাধা সৃষ্টি করে। সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, কিশোর গ্যাং, পাতিনেতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

নির্মাণ খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের মালিক আজমল হক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, তাদের খাতের চাঁদাবাজি সাধারণত কয়েকটি উপায়ে হয়ে থাকে। কাজ শুরু করার আগে বা কাজ চলাকালে নির্দিষ্ট অঙ্কের মোটা টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। স্থানীয় সিন্ডিকেট বা চাঁদাবাজেরা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে নিম্নমানের ইট, বালু, রড বা সিমেন্ট কিনতে ঠিকাদারদের বাধ্য করে।

এ ছাড়া নিজস্ব লোকজনকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য করা ও তাদের জন্য অতিরিক্ত মজুরি দাবি করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এই চাঁদাবাজির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। চাঁদার টাকা ও সিন্ডিকেটের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অতিরিক্ত খরচের কারণে ঠিকাদারেরা লাভ টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় রড, সিমেন্ট বা অন্যান্য উপকরণের গুণগত মান কমিয়ে দেন।

ক্রমাগত চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তার অভাবে দেশি-বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। ’ সাবেক উপদেষ্টা, অপরাধ গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাখাওয়াত হোসেন বিষয়টিকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক রূপান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘অপরাধীরা এখন অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে চলে।

তারা জানে যে সরাসরি অস্ত্র উঁচিয়ে চাঁদাবাজি করলে বা গোলাগুলি করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র তাড়া খাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং গণমাধ্যমে দ্রুত আলোড়ন তৈরি হয়। তাই তারা মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেল কিংবা জাপানিজ ইয়াকুজাদের মতো ‘করপোরেট অপরাধ মডেল’ বা মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শনের কৌশল বেছে নিয়েছে। এই সুতা বা ভিজ্যুয়াল কোড হলো এক ধরনের ‘সাইলেন্ট টেরর’ বা নিঃশব্দ সন্ত্রাস।

অপরাধীরা সহিংসতার ঝুঁকি ছাড়াই কোটি কোটি টাকা তুলছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত অ্যালার্মিং। এটি প্রমাণ করে যে মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী এবং তারা পুরো ব্যবস্থার গলদগুলো খুব ভালো করে জানে। ’’ এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘অপরাধীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে।

এই সুতা বা টোকেন কালচারটি আমাদের নজরে এসেছে। তবে বড় সমস্যা হলো, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বা ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাচ্ছি না। তারা চুরির মামলা বা জিডি করেন, কিন্তু চাঁদাবাজির মূল বিষয়টি গোপন রাখেন। চাঁদাবাজি নিয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছি। আমরা ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করছি, তারা যদি গোপনে আমাদের তথ্য দেন বা ৯৯৯-এ ফোন করে বলেন, তবে বিশেষ দল পাঠিয়ে এই নিঃশব্দ সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলব।