চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের স্থিতি এখন ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। নগদ অর্থের ছড়াছড়ি এমন সময়ে বাড়ছে, যখন দেশের ব্যাংক খাতে পেমেন্টব্যবস্থা অনেক বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। গ্রাহকেরা চাইলে ঘরে বসেই ব্যাংকে যেকোনো অংকের অর্থ লেনদেন করতে পারছেন।
ব্যাংকের অ্যাপস কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে যখন খুশি কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বলছেন, নগদ অর্থের বড় অংশ ব্যাংকের বাইরে থাকলে তা আর্থিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রবাহে যুক্ত হয় না। এতে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা কমে।
ঋণ ও বিনিয়োগে অর্থের জোগান সংকুচিত হয়। উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বিপুল নগদ অর্থ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার, কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় ও অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও দুর্বল হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেড় দশক আগে ২০১১ সালে দেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
এর পরের বছরগুলোয় দ্রুতগতিতে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়তে থাকে। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকায়। এক বছর পর ২০২২ সালের জুনে এই অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আর ২০২৩ সালের জুনে এসে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায় ঠেকে।
তবে ২০২৪ ও ২৫ সালে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের স্থিতি ওঠানামার মধ্যে থাকলেও সেটি খুব বেশি বাড়েনি। গত বছরের জুনে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মে মাসে এ স্থিতি বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় ঠেকে। এরপর জুনে এসে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার ইস্যুতে ব্যাংকটিতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
এর জেরে দেশের সবচেয়ে বড় এই ব্যাংক থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত বের হয়ে যায়। এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা ধারও দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের অন্য অনেক ব্যাংক থেকেও গ্রাহকদের একটি অংশ আমানতের অর্থ তুলে নিয়েছিল।
এ কারণে জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর জুলাইয়ে এসে এ স্থিতি ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকে। তবে এ মুহূর্তে নগদ টাকার চাহিদা কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি বছর ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।
যদিও এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার আমানত বেড়েছিল। সে হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকগুলোয় গ্রাহকদের জমাকৃত আমানতের স্থিতি ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘দেশের সব মার্চেন্টকে আমরা বাংলা কিউআরের আওতায় নিয়ে এসেছি।
আরটিজিএস, এনপিএসবি, এমএফএসসহ সব ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জনপ্রিয় ও দ্রুতগতির। এর পরও ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াটি উদ্বেগের। বিরাজমান পরিস্থিতিতে মানুষ ব্যাংকবিমুখী হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তবে ব্যাংক খাতে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
’


















