2:46 pm, Thursday, 30 July 2026

রঙিন পোশাকে জীবনের অভাব জয় করে স্বাবলম্বী ‘ঘটি গরম’ ফেরিওয়ালা হাবিব

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:25:41 pm, Thursday, 30 July 2026
  • 4
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মানুষের জীবন যেন এক এক রহস্যময় গল্পের বই। সেই গল্পের পাতায় পাতায় কখনো জমা হয় বিষাদের ছায়াপাত, আবার কখনো ফুটে ওঠে অদম্য সাহসের রূপকথা। তেমনই এক জীবনযুদ্ধের অদম্য সৈনিকের নাম হাবিব গাজি। একসময় উপকূলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অভাবের কঠোর কষাঘাতে থমকে গিয়েছিল তার জীবন। কিন্তু হার মানেননি তিনি। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আজ ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার অলিগলিতে রং-বেরঙের পোশাকে ‘ঘটি গরম’ বিক্রি করে হাসি মুখে সংসার চালাচ্ছেন। তার এই বর্ণিল জীবনযাত্রা আর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প আজ শত শত হতাশাগ্রস্ত মানুষের অনুপ্রেরণা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার অতি-ঝুঁকিপূর্ণ গাবুরা উপকূলের সন্তান হাবিব গাজি (পিতা: মৃত মহর গাজি)। গাবুরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কাজ পাওয়া ছিল লটারি জেতার মতো। একদিন কাজ মিললে দুই দিন থাকতে হতো অনাহারে। সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে যখন দিশাহারা অবস্থা, তখন বুকভরা কষ্ট আর সামান্য সম্বল নিয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামে আশ্রয় নেন তিনি। নতুন জায়গায় এসে কী করবেন, তা নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না। অবশেষে জীবন সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন মুখরোচক খাদ্য ‘ঘটি গরম’ বিক্রি। আর এই একটি সিদ্ধান্তই তার জীবনের চাকা ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরিয়ে দিয়েছে। হাবিব গাজির ঘটি গরম বিক্রি শুধু পেটের তাগিদ নয়, এটি যেন এক জীবন্ত শিল্প! তার বিক্রির কায়দা ও পোশাকে রয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য। প্রতিদিন নতুন রূপ : প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পোশাক ও রকমারি সাজার মাধ্যমে নিজের মধ্যে এক আনন্দময় চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন। স্লোগানের ঝংকার : ‘ঘটি গরম লেবে’ হাঁক আর মিষ্টি মুখের হাসিতে মুহূর্তেই মুখরিত করে তোলেন ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার হাট-বাজার। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু: তার এই ভিন্নধর্মী উপস্থাপন ছোট-বড় সব বয়সি ক্রেতাকেই সহজে আকৃষ্ট করে। সাফল্যের গল্প শোনাতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাবিব গাজি বলেন, ‘গাবুরায় থাকতে কাজের অভাবে অনেক কষ্টে দিন কাটাতাম। কিন্তু এই ঘটি গরম বিক্রি শুরু করার পর আল্লাহ আমাকে খুব ভালো রেখেছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫০০ টাকার ঘটি গরম বিক্রি করি, যার মধ্যে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নিট লাভ থাকে। এই আয়ে শুধু যে সংসার চলছে তা নয়—দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে খুব ধুমধাম করে দিয়েছি। ছোট মেয়েটিও বড় হচ্ছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন আর কোনো অভাব নেই।’ টাকার অঙ্কের চেয়েও হাবিব গাজির বড় অর্জন—মনের প্রশান্তি ও আত্মমর্যাদা। কষ্টের দিনগুলো আজ তার কাছে শুধুই দূর অতীত। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা আর পরিশ্রম থাকলে যে শূন্য থেকেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, হাবিব গাজি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তার বর্ণিল পোশাক আর ঝাল-মিষ্টি ‘ঘটি গরম’ আজ শুধু পেটের ভাত জোগায় না, সমাজের হাজারো যুবকের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে মনে করিয়ে দেয়—অধ্যবসায় ও চেষ্টার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য সব প্রতিকূলতা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

রঙিন পোশাকে জীবনের অভাব জয় করে স্বাবলম্বী ‘ঘটি গরম’ ফেরিওয়ালা হাবিব

Update Time : 12:25:41 pm, Thursday, 30 July 2026

মানুষের জীবন যেন এক এক রহস্যময় গল্পের বই। সেই গল্পের পাতায় পাতায় কখনো জমা হয় বিষাদের ছায়াপাত, আবার কখনো ফুটে ওঠে অদম্য সাহসের রূপকথা। তেমনই এক জীবনযুদ্ধের অদম্য সৈনিকের নাম হাবিব গাজি। একসময় উপকূলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর অভাবের কঠোর কষাঘাতে থমকে গিয়েছিল তার জীবন। কিন্তু হার মানেননি তিনি। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আজ ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার অলিগলিতে রং-বেরঙের পোশাকে ‘ঘটি গরম’ বিক্রি করে হাসি মুখে সংসার চালাচ্ছেন। তার এই বর্ণিল জীবনযাত্রা আর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প আজ শত শত হতাশাগ্রস্ত মানুষের অনুপ্রেরণা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার অতি-ঝুঁকিপূর্ণ গাবুরা উপকূলের সন্তান হাবিব গাজি (পিতা: মৃত মহর গাজি)। গাবুরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কাজ পাওয়া ছিল লটারি জেতার মতো। একদিন কাজ মিললে দুই দিন থাকতে হতো অনাহারে। সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে যখন দিশাহারা অবস্থা, তখন বুকভরা কষ্ট আর সামান্য সম্বল নিয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামে আশ্রয় নেন তিনি। নতুন জায়গায় এসে কী করবেন, তা নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না। অবশেষে জীবন সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন মুখরোচক খাদ্য ‘ঘটি গরম’ বিক্রি। আর এই একটি সিদ্ধান্তই তার জীবনের চাকা ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরিয়ে দিয়েছে। হাবিব গাজির ঘটি গরম বিক্রি শুধু পেটের তাগিদ নয়, এটি যেন এক জীবন্ত শিল্প! তার বিক্রির কায়দা ও পোশাকে রয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য। প্রতিদিন নতুন রূপ : প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পোশাক ও রকমারি সাজার মাধ্যমে নিজের মধ্যে এক আনন্দময় চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন। স্লোগানের ঝংকার : ‘ঘটি গরম লেবে’ হাঁক আর মিষ্টি মুখের হাসিতে মুহূর্তেই মুখরিত করে তোলেন ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার হাট-বাজার। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু: তার এই ভিন্নধর্মী উপস্থাপন ছোট-বড় সব বয়সি ক্রেতাকেই সহজে আকৃষ্ট করে। সাফল্যের গল্প শোনাতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাবিব গাজি বলেন, ‘গাবুরায় থাকতে কাজের অভাবে অনেক কষ্টে দিন কাটাতাম। কিন্তু এই ঘটি গরম বিক্রি শুরু করার পর আল্লাহ আমাকে খুব ভালো রেখেছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫০০ টাকার ঘটি গরম বিক্রি করি, যার মধ্যে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নিট লাভ থাকে। এই আয়ে শুধু যে সংসার চলছে তা নয়—দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে খুব ধুমধাম করে দিয়েছি। ছোট মেয়েটিও বড় হচ্ছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন আর কোনো অভাব নেই।’ টাকার অঙ্কের চেয়েও হাবিব গাজির বড় অর্জন—মনের প্রশান্তি ও আত্মমর্যাদা। কষ্টের দিনগুলো আজ তার কাছে শুধুই দূর অতীত। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা আর পরিশ্রম থাকলে যে শূন্য থেকেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, হাবিব গাজি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তার বর্ণিল পোশাক আর ঝাল-মিষ্টি ‘ঘটি গরম’ আজ শুধু পেটের ভাত জোগায় না, সমাজের হাজারো যুবকের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে মনে করিয়ে দেয়—অধ্যবসায় ও চেষ্টার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য সব প্রতিকূলতা।