ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা বলে আসছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইসরায়েলিদের বোঝাতে চান, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তার বিকল্প নেই। শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো নেতানিয়াহু আমেরিকান উচ্চারণে কথা বলার ক্ষেত্রে সাবলীল। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি সম্পর্কে নিজের বিশেষ বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করে আসছেন। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল এবং তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অবিচল সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। একটা সময় মনে হচ্ছিল, অতীতের সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পই ইসরায়েলের প্রতি, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল। বিশেষ করে ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসনে অংশ নিতে সম্মত হওয়ায় সেই ধারণা আরও জোরালো হয়েছিল। কারণ, তিনিই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়ায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে ট্রাম্পের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা তীব্র হওয়ায় সেই ধারণা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্পকার্ড’ আগের মতো আর কাজ না-ও করতে পারে। এমন অবস্থায় নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফর করছেন। গত মঙ্গলবার তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর এটাই তার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। নেতানিয়াহুর এই সফরকে তার জন্য নতুনভাবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তুলে ইসরায়েলের জনগণকে দেখানোর সুযোগ খুঁজবেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখনো আছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্কে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং ইরান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হতে পারেÑ এই কথাগুলো বলে ট্রাম্পকে তেহরানে আগ্রাসন চালাতে রাজি করিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও নেতানিয়াহুকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর প্রতি তার নমনীয় অবস্থান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। এমনকি এসব বসতি স্থাপনকারীর হাতে বিচারবহির্ভূতভাবে একজন মার্কিন সিনেটরকে আটক করার ঘটনাও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে সম্মত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কে দেশটির সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিঙ্কাস আলজাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করাটাই নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরের আসল উদ্দেশ্য। তিনি দাবি করছেন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সদ্য প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। পিঙ্কাস মনে করেন, নেতানিয়াহুর এই সফরের উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, ইসরায়েলের মিত্র ও সমালোচকদের বোঝানো, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক এখনো আগের মতোই অটুট। দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহু আশা করছেন, তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় তাকে ক্ষমা করতে ট্রাম্প আহ্বান জানাবেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলে ট্রাম্পের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করেন পিঙ্কাস। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি শিবিরের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বও নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক টাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েল সরকারের কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েল সরকারের কয়েকজন ব্যক্তি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে তার মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু এমন একসময় ওয়াশিংটন সফর করছেন, যখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি এখন অনেকটাই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন।’ এ সফরে প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কোনো মতবিরোধ দেখা যাবে বলে খুব কম মানুষই মনে করছেন। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপনের কাজটি নেতানিয়াহুর জন্য আগের মতো সহজ নাও হতে পারে। অথচ আসন্ন নির্বাচনে এটি তার অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি। ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী এবং ১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অতীত রেকর্ড খুবই ভালো। কিন্তু তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্টও করেছেন।’ মিচেল বারাক বলেন, নেতানিয়াহুর সমালোচনা শুধু রিপাবলিকান পার্টির জাতীয়তাবাদী অংশের নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; দলটিতে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মধ্য ডানপন্থি অংশের অনেক নেতাও এখন তার সমালোচনা করছেন।
6:08 am, Friday, 31 July 2026
শিরোনাম :
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্পকার্ড’ কার্যকারিতা হারাচ্ছে?
-
MIT ERP
- Update Time : 03:11:30 am, Thursday, 30 July 2026
- 3
Tag :
Popular Post















