আজ বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৩°C
সর্বোচ্চ: ২৯°C
সর্বনিম্ন: ২৩°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

চিকিৎসককে অসম্মান ও অনিরাপদ রেখে নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব নয়

  • MIT ERP
  • Update Time : 02:00:10 am, Thursday, 5 November 2026
  • 13

চিকিৎসককে অসম্মান ও অনিরাপদ রেখে নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব নয়

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে চিকিৎসকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের সমাজে চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে ক্রমাগত অসম্মান একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যখন একজন চিকিৎসক নিজেই নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন তার পক্ষে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে রোগীর সেবা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সবার আগে মনে রাখতে হবে, চিকিৎসকও একজন মানুষ। অন্য যেকোনো পেশার মানুষের মতো তারও বেঁচে থাকার, নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার এবং সম্মান পাওয়ার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রয়েছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং ত্যাগের বিনিময়ে একজন মানুষ চিকিৎসক হয়ে ওঠেন।

অথচ কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়। চিকিৎসকের জীবনের মূল্যকে যদি রাষ্ট্র ও সমাজ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারে, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবক্ষয় ডেকে আনবে। চিকিৎসকদের অনিরাপদ রেখে কি নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব? সংক্ষেপে উত্তর হলো, না, কখনোই সম্ভব নয়। চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মনস্তাত্ত্বিক একটি বিষয়।

একজন চিকিৎসককে প্রতিটি মুহূর্তে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁতভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু যখন কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে সহিংস ও ভীতিসন্ত্রস্ত, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি চিকিৎসার মানের ওপর পড়ে। ভাঙচুর বা গায়ে হাত তোলার আতঙ্কের মধ্যে থাকলে একজন চিকিৎসকের পক্ষে মনোযোগ দিয়ে জটিল রোগীর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকেরা যখন বুঝতে পারেন যে, কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তার দায়ভার বা সহিংসতা তাদের ওপর আসবে, তখন তারা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর চিকিৎসা করতে ভয় পান। তারা রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার বা স্থানান্তর করে দিতে বাধ্য হন, যা রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে। অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে তরুণ চিকিৎসকেরা দেশত্যাগ করছেন অথবা পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

এর ফলে ভবিষ্যতে দেশে দক্ষ চিকিৎসকের তীব্র সংকট তৈরি হবে। আমাদের সমাজে বড় একটি ভুল ধারণা রয়েছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগীর মৃত্যু হলেই ধরে নেওয়া হয়, চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুলের কারণে হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো চিকিৎসারই শতভাগ নিশ্চয়তা থাকে না। একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগতভাবে বা মেডিকেল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত।

কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভাঙচুর করা বা চিকিৎসককে মারধর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রোগীর নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে, আগে চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে যোগাযোগের গ্যাপ বা দূরত্ব দূর করতে হবে। আমি এটাও মনে করি যে, রোগীর অবস্থা সম্পর্কে স্বজনদের নিয়মিত ও স্পষ্টভাবে অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। মিডিয়া ও সমাজকেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের খাটো করে দেখার মানসিকতা পরিহার করে তাদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে।

চিকিৎসক এবং রোগী একে অপরের পরিপূরক। চিকিৎসককে ভয়ের মধ্যে রেখে, অসম্মানিত করে কখনো একটি আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোগীর নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রথম শর্তই হলোÑ চিকিৎসকের নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ। সমাজ ও রাষ্ট্র যেদিন চিকিৎসকের জীবনের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে, সেদিনই দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃত ও নিরাপদ চিকিৎসাসেবা লাভ করবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও কনকর্ড হেলথকেয়ার গ্রুপের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত

চিকিৎসককে অসম্মান ও অনিরাপদ রেখে নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব নয়

Update Time : 02:00:10 am, Thursday, 5 November 2026

একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে চিকিৎসকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের সমাজে চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে ক্রমাগত অসম্মান একটি মারাত্মক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যখন একজন চিকিৎসক নিজেই নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন তার পক্ষে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে রোগীর সেবা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সবার আগে মনে রাখতে হবে, চিকিৎসকও একজন মানুষ। অন্য যেকোনো পেশার মানুষের মতো তারও বেঁচে থাকার, নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার এবং সম্মান পাওয়ার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রয়েছে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং ত্যাগের বিনিময়ে একজন মানুষ চিকিৎসক হয়ে ওঠেন।

অথচ কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়। চিকিৎসকের জীবনের মূল্যকে যদি রাষ্ট্র ও সমাজ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারে, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবক্ষয় ডেকে আনবে। চিকিৎসকদের অনিরাপদ রেখে কি নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব? সংক্ষেপে উত্তর হলো, না, কখনোই সম্ভব নয়। চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মনস্তাত্ত্বিক একটি বিষয়।

একজন চিকিৎসককে প্রতিটি মুহূর্তে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁতভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু যখন কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে সহিংস ও ভীতিসন্ত্রস্ত, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি চিকিৎসার মানের ওপর পড়ে। ভাঙচুর বা গায়ে হাত তোলার আতঙ্কের মধ্যে থাকলে একজন চিকিৎসকের পক্ষে মনোযোগ দিয়ে জটিল রোগীর সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকেরা যখন বুঝতে পারেন যে, কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তার দায়ভার বা সহিংসতা তাদের ওপর আসবে, তখন তারা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর চিকিৎসা করতে ভয় পান। তারা রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার বা স্থানান্তর করে দিতে বাধ্য হন, যা রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে। অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে তরুণ চিকিৎসকেরা দেশত্যাগ করছেন অথবা পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

এর ফলে ভবিষ্যতে দেশে দক্ষ চিকিৎসকের তীব্র সংকট তৈরি হবে। আমাদের সমাজে বড় একটি ভুল ধারণা রয়েছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগীর মৃত্যু হলেই ধরে নেওয়া হয়, চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুলের কারণে হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো চিকিৎসারই শতভাগ নিশ্চয়তা থাকে না। একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগতভাবে বা মেডিকেল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত।

কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভাঙচুর করা বা চিকিৎসককে মারধর করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রোগীর নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে, আগে চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে যোগাযোগের গ্যাপ বা দূরত্ব দূর করতে হবে। আমি এটাও মনে করি যে, রোগীর অবস্থা সম্পর্কে স্বজনদের নিয়মিত ও স্পষ্টভাবে অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। মিডিয়া ও সমাজকেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের খাটো করে দেখার মানসিকতা পরিহার করে তাদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে।

চিকিৎসক এবং রোগী একে অপরের পরিপূরক। চিকিৎসককে ভয়ের মধ্যে রেখে, অসম্মানিত করে কখনো একটি আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোগীর নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রথম শর্তই হলোÑ চিকিৎসকের নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ। সমাজ ও রাষ্ট্র যেদিন চিকিৎসকের জীবনের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে, সেদিনই দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃত ও নিরাপদ চিকিৎসাসেবা লাভ করবে।