আজ বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৪°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১২%

পোশাক খাতের আন্দোলনের আড়ালে সক্রিয় ঝুটসন্ত্রাসীরা

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:02:35 pm, Wednesday, 4 November 2026
  • 12

পোশাক খাতের আন্দোলনের আড়ালে সক্রিয় ঝুটসন্ত্রাসীরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ও নাশকতার নেপথ্যে ঝুট সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোটি কোটি টাকার ঝুট বাণিজ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

এই ঝুট সন্ত্রাসীরা পতিত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন প্রভাবশালীর লাঠিয়াল হিসেবে পরিচিত। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট বাণিজ্য দীর্ঘদিন এদের দখলে ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এরা ঝুট ব্যবসার আধিপত্য থেকে বিতাড়িত হয়। ঝুট বাণিজ্যে নতুন করে ঝেঁকে বসে ক্ষমতাসীনদের একটি চক্র। এই অবস্থায় সাধারণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর যৌক্তিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ব্যাবসায়িক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার পেছনে ঝুট ব্যবসার বিরোধের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরোনো ও নতুন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

নতুন পক্ষের কেউ কেউ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আবার পুরোনোদের কেউ নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আধিপত্য হারানো কয়েকটি পক্ষ আগের অবস্থান ফিরে পেতে তৎপর। অভিযোগ রয়েছে, এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি শ্রমিকদের আন্দোলনে নিজেদের লোকজন ঢুকিয়ে পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলার চেষ্টা করছে।

এরই মধ্যে মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন ও স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারী এবং শ্রমিক নেতারা দাবি করছেন, তারা সহিংস আন্দোলনে জড়িত নন। আবার প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও বলছে, আন্দোলনের আড়ালে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিচ্ছে। ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাভারের এক প্রভাবশালী ঝুট ব্যবসায়ী বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি নতুন পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যাবসায়িক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। গতকাল সাভারের হেমায়েতপুর পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এবং উলাইল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়।

এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এই ঘটনার নেপথ্যে ওই ঝুট ব্যবসায়ীর লোকজন জড়িত থাকতে পারে এমন ধারণা করে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থা। অন্যদিকে, আশুলিয়া ও ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ডিইপিজেড) ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও তার অনুসারীদের প্রভাব ছিল। তিনি মৃত্যুদণ্ডের দায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করায় তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসার বড় একটি অংশ অন্যদের হাতে চলে গেছে।

এ অবস্থায় পুরোনো আধিপত্য হারানো এই সাবেক এমপির পক্ষের লোকজন নেপথ্যে থেকে শ্রমিক আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে আশুলিয়া এলাকার শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়া থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ।

তারা হলেন— জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম (৩৭), বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম (৪৮) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মনসুর আলী (৪৬)। ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের ওসি সাইদুল ইসলাম বলেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দিয়ে অস্থিরতা তৈরির যথাযথ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া আরও ১৩ উসকানিদাতাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুধু সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেই নয়, অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও নজরদারি বাড়িয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, উসকানিদাতা হিসেবে শনাক্ত করে প্রায় দেড়শ ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত করতে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, উসকানিদাতাদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পোশাক কারখানায় উৎপাদনের সময় কাপড়ের কাটা অংশ, বাতিল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য (ঝুট) তৈরি হয়। এর একটি অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বাজারে এসব ঝুটের চাহিদা রয়েছে। কাপড়ের ধরন ও মান অনুযায়ী এগুলো বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফলে কারখানার বর্জ্য বিক্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ব্যাবসায়িক বাজার। সাধারণত কারখানা কর্তৃপক্ষই কাগজে-কলমে ঝুটের ক্রেতা নির্বাচন ও বিক্রির শর্ত নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এসব সন্ত্রাসীর ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করে কারখানার ঝুট বিক্রি এবং দাম নির্ধারণ। কোনো ব্যবসায়ী বৈধ চুক্তির মাধ্যমে ঝুট কিনলেও অন্য পক্ষ বলপ্রয়োগ করে সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যায়।

শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি চাঁদা দাবি, পরিবহনে বাধা ও ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ১৯ অক্টোবর গাজীপুরে ঝুটের প্রতি কেজিতে তিন টাকা চাঁদা দাবি, টাকা না দেওয়ায় মালামাল পরিবহনে বাধা এবং ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।

শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনায় কারা জড়িত, ব্যাবসায়িক বিরোধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক কী এবং অভিযোগের পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের অধিকার রয়েছে।

সেই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ নাশকতার চেষ্টা করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

পোশাক খাতের আন্দোলনের আড়ালে সক্রিয় ঝুটসন্ত্রাসীরা

Update Time : 11:02:35 pm, Wednesday, 4 November 2026

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ও নাশকতার নেপথ্যে ঝুট সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোটি কোটি টাকার ঝুট বাণিজ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

এই ঝুট সন্ত্রাসীরা পতিত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন প্রভাবশালীর লাঠিয়াল হিসেবে পরিচিত। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট বাণিজ্য দীর্ঘদিন এদের দখলে ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এরা ঝুট ব্যবসার আধিপত্য থেকে বিতাড়িত হয়। ঝুট বাণিজ্যে নতুন করে ঝেঁকে বসে ক্ষমতাসীনদের একটি চক্র। এই অবস্থায় সাধারণ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর যৌক্তিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ব্যাবসায়িক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার পেছনে ঝুট ব্যবসার বিরোধের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরোনো ও নতুন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

নতুন পক্ষের কেউ কেউ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আবার পুরোনোদের কেউ নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আধিপত্য হারানো কয়েকটি পক্ষ আগের অবস্থান ফিরে পেতে তৎপর। অভিযোগ রয়েছে, এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি শ্রমিকদের আন্দোলনে নিজেদের লোকজন ঢুকিয়ে পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলার চেষ্টা করছে।

এরই মধ্যে মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন ও স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারী এবং শ্রমিক নেতারা দাবি করছেন, তারা সহিংস আন্দোলনে জড়িত নন। আবার প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও বলছে, আন্দোলনের আড়ালে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিচ্ছে। ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাভারের এক প্রভাবশালী ঝুট ব্যবসায়ী বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি নতুন পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যাবসায়িক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। গতকাল সাভারের হেমায়েতপুর পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এবং উলাইল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়।

এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এই ঘটনার নেপথ্যে ওই ঝুট ব্যবসায়ীর লোকজন জড়িত থাকতে পারে এমন ধারণা করে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থা। অন্যদিকে, আশুলিয়া ও ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ডিইপিজেড) ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম ও তার অনুসারীদের প্রভাব ছিল। তিনি মৃত্যুদণ্ডের দায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করায় তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসার বড় একটি অংশ অন্যদের হাতে চলে গেছে।

এ অবস্থায় পুরোনো আধিপত্য হারানো এই সাবেক এমপির পক্ষের লোকজন নেপথ্যে থেকে শ্রমিক আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে আশুলিয়া এলাকার শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়া থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ।

তারা হলেন— জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম (৩৭), বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম (৪৮) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মনসুর আলী (৪৬)। ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের ওসি সাইদুল ইসলাম বলেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দিয়ে অস্থিরতা তৈরির যথাযথ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করা হয়।

এ ছাড়া আরও ১৩ উসকানিদাতাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুধু সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেই নয়, অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও নজরদারি বাড়িয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, উসকানিদাতা হিসেবে শনাক্ত করে প্রায় দেড়শ ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত করতে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, উসকানিদাতাদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পোশাক কারখানায় উৎপাদনের সময় কাপড়ের কাটা অংশ, বাতিল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য (ঝুট) তৈরি হয়। এর একটি অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বাজারে এসব ঝুটের চাহিদা রয়েছে। কাপড়ের ধরন ও মান অনুযায়ী এগুলো বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফলে কারখানার বর্জ্য বিক্রিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ব্যাবসায়িক বাজার। সাধারণত কারখানা কর্তৃপক্ষই কাগজে-কলমে ঝুটের ক্রেতা নির্বাচন ও বিক্রির শর্ত নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এসব সন্ত্রাসীর ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করে কারখানার ঝুট বিক্রি এবং দাম নির্ধারণ। কোনো ব্যবসায়ী বৈধ চুক্তির মাধ্যমে ঝুট কিনলেও অন্য পক্ষ বলপ্রয়োগ করে সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যায়।

শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি চাঁদা দাবি, পরিবহনে বাধা ও ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ১৯ অক্টোবর গাজীপুরে ঝুটের প্রতি কেজিতে তিন টাকা চাঁদা দাবি, টাকা না দেওয়ায় মালামাল পরিবহনে বাধা এবং ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া গত জুলাইয়ে টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।

শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনায় কারা জড়িত, ব্যাবসায়িক বিরোধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক কী এবং অভিযোগের পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের অধিকার রয়েছে।

সেই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ নাশকতার চেষ্টা করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।