যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে জয়ের বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা, নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপ সব মিলিয়ে আশাবাদী দলটির নেতারা।
আজ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি সিনেটেও ভালো ফলের আশা করছেন তারা। তবে জনমত জরিপের এই পূর্বাভাস কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। খবর বিবিসির। বিভিন্ন জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের ২১৮ আসনের প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে বেশি আসনে ডেমোক্র‍্যাট প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনেও তাদের অবস্থান শক্তিশালী বলে জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে সমান সমর্থনের চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই রাজ্যে ট্রাম্প ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
সিএনএনের সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপে টেক্সাস, কানসাস ও মেইন অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র‍্যাট প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার তথ্য এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি ইতিহাস বলছে, জনমত জরিপ সব সময় সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে না। বিশেষ করে ট্রাম্পের নির্বাচনি পারফরম্যান্স জরিপ পরিচালনাকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জরিপের পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
আবার ২০২০ সালে জো বাইডেনের কাছে ট্রাম্পের পরাজয়ের ব্যবধানও অনেক জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে কম ছিল। সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রাথমিক নির্বাচনেও জরিপের সঙ্গে বাস্তব ফলের বড় পার্থক্য দেখা গেছে। চলতি বছর মিশিগানে ডেমোক্র‍্যাটদের সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে আবদুল এল-সাইয়েদের বড় ব্যবধানে জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল জরিপগুলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবধান দাঁড়ায় মাত্র ১ শতাংশে।
উইসকনসিনে গভর্নর পদে ডেমোক্র‍্যাট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনেও প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা প্রার্থী সামান্য ব্যবধানে হেরে যান। ইপসোস পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট ক্লিফোর্ড ইয়ংয়ের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে জনমত জরিপ পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক মানুষ এখন আর ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করেন না। অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনও ধরতে চান না।
ফলে জরিপকারীদের পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে, তাদের অনেকেই জরিপে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিশেষ করে রক্ষণশীল ও কট্টর ডানপন্থী ভোটারদের একটি অংশ জরিপে অংশ নিতে অনাগ্রহী। ইয়ংয়ের মতে, এই শ্রেণির ভোটারদের মতামত যথাযথভাবে জরিপে প্রতিফলিত না হলে রিপাবলিকানদের প্রকৃত সমর্থন কম দেখা যেতে পারে।
ফলে জরিপের ফল ডেমোক্র‍্যাটদের পক্ষে বেশি ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনগুলোয়ও ট্রাম্পের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি জরিপ পরিচালনাকারীদের হিসাবের বাইরে ছিল। তার অনেক সমর্থক নিয়মিত ভোটার না হলেও নির্বাচনের দিন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসেন। এই অনিশ্চয়তা জরিপের পূর্বাভাসে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনি সমীকরণে বাধা : মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। ২০১০ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামার ডেমোক্রে‍টিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদের ৬০টির বেশি আসন হারিয়েছিল। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এবং ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়ে রক্ষণশীলদের অসন্তোষ ওই নির্বাচনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এবার পরিস্থিতি অনেকটা উল্টো। ডেমোক্র‍্যাটরা বিরোধী দলে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াও বিরোধীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে শুধু এসব কারণে নির্বাচনে বড় ব্যবধানে সাফল্য আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অনেক এলাকাতেই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প সহজে জয়ী হয়েছিলেন।
ফলে এসব এলাকায় রিপাবলিকানদের সাংগঠনিক ও ভোটভিত্তিক সুবিধা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে আগের তুলনায় কম আসনে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বদলানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় দোদুল্যমান ভোটারের সংখ্যা কমেছে। অনেক ভোটার আগে থেকেই নির্দিষ্ট দলের প্রতি অনুগত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা।
শেষ কয়েক সপ্তাহে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে দলটি কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। শেষ মুহূর্তের ভোটেই নির্ধারিত হতে পারে ফল : তবে জনমত জরিপের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সামগ্রিক চিত্র বুঝতে একাধিক জরিপের গড় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি জরিপেরই নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত ভুলের সীমা থাকে। নমুনার আকার ও সামগ্রিক ভোটার জনগোষ্ঠীর অনুপাতের ওপর এই সীমা নির্ভর করে।
তাই একটি জরিপের পরিবর্তে একাধিক প্রতিষ্ঠানের জরিপের সম্মিলিত ফল তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। এবারের নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের ভোটার উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখনো অনেক নির্বাচনি এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন। তারা শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেবেন, তার ওপর ফলের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
আবার গত বছরের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন ও বিশেষ নির্বাচনে জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন ডেমোক্র‍্যাটরা। সব মিলিয়ে জনমত জরিপ নির্বাচনের সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরলেও তা চূড়ান্ত ফলের নিশ্চয়তা দেয় না। ভোটারদের অংশগ্রহণ, দলীয় সমর্থকদের উপস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে।
ইপসোসের প্রেসিডেন্ট ক্লিফোর্ড ইয়ংয়ের ভাষায়, জরিপ পরিচালনার পদ্ধতি উন্নত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত অনুমান করা সব সময়ই কঠিন।





















