ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিগোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত নতুন করে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের দাবি, হুতিদের ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পড়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও তেল পরিবহনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবিও করেছে হুতিরা। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ মক্কার পূর্ব দিকের ওয়াদি আল মুগাম্মাস উপত্যকায় পড়ে।
এলাকাটি আরাফাত ময়দানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কাছে এবং পবিত্র কাবা শরিফ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। এ ছাড়া জেদ্দার আল নুজহা এলাকা, তায়েফের ওয়াদি জলিল এবং জেদ্দার উত্তর-পশ্চিমের রাবিঘ অঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
১০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি : সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, সৌদির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। তায়েফ, জাজান এবং আসির প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় সম্ভাব্য বিপদের সতর্কবার্তাও জারি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
জোটের দাবি, রাজধানী রিয়াদ, তায়েফ ও মদিনা প্রদেশের ইয়ানবু শহর লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল হুতিরা। এ ছাড়া সৌদির পূর্বাঞ্চলের আকাশে একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছে জোট। দুই সপ্তাহ পর রিয়াদের বিমানবন্দর চালু : হুতিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকা রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবার ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল ধাপে ধাপে পুনরায় চালু করা হচ্ছে। যাত্রীদের যাত্রার আগে টিকিট ও উড়োজাহাজ চলাচলের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইয়েমেনেও পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষ : সৌদি আরবের পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হুতিরা দাবি করেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে সৌদি বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা নৌঘাঁটি ও সামরিক শিবিরে হামলা চালানো হয়েছে।
শহরটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অস্থায়ী সদর দপ্তর। হুতিদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ, সৌদি আরব ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। সানা শহরের একটি বাড়িতে চারজন, শ্রমিকদের আবাসিক ভবনে আটজন এবং হোদেইদা শহরের বাইরে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে ওই সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে।
তবে সৌদি আরব এসব হামলার দায় স্বীকার করেনি। এদিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলে অভিযান জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তায়েজ শহরের কাছে জাবাল সাবর পর্বতমালা ঘিরেও দুই পক্ষের লড়াই চলছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা সম্প্রসারণ করছে সৌদি : হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সৌদি আরবের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে আল-দুওয়াদিমি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি স্থাপনা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বেশি দূরে আঘাত হানতে কিংবা অধিক ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম হতে পারে। তবে ছবির বিশ্লেষণ থেকে কারখানাটির প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা বা সেখানে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা : সৌদির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে ইরান ও তাদের সমর্থিত হুতিদের হামলা মোকাবিলায় দেশটির সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হতে পারে।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরবের অবস্থানও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে। সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে উদ্বেগ রয়েছে, তার সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হওয়ায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা এবং পাল্টা সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; লোহিত সাগরের নৌবাণিজ্য ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।






















