শীতের আগমনী বার্তায় কুয়াশার ঘন চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। হিমেল বাতাস, নদীর বুকে ভেসে থাকা ধোঁয়াটে কুয়াশা আর বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠে প্রকৃতি এখন সেজেছে এক মায়াবী নতুন রূপে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মেঘনার বুকে কুয়াশার আস্তরণ, সারি সারি সবুজ গাছপালা, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ আর গ্রামীণ জনপদের স্নিগ্ধ দৃশ্য তৈরি করছে এক অপরূপ পরিবেশ।
প্রকৃতির এমন মুগ্ধকর সৌন্দর্যে শীতের ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের যেন এক অনন্য হাতছানি দিচ্ছে ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা। জেলা শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদীবেষ্টিত এই দ্বীপ তার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। নগরজীবনের ব্যস্ত কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি পরিবেশে প্রিয়জনদের নিয়ে সময় কাটানো, নদীর বৈচিত্র্যময় রূপ উপভোগ করা কিংবা প্রকৃতির একদম কাছাকাছি যাওয়ার জন্য মনপুরা হতে পারে পর্যটকদের অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।
শীতের সকালে এখানকার প্রকৃতি যেন একদম ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকা নদী, ঠান্ডা বাতাসের পরশ আর সূর্যের প্রথম আলোর মিতালি মুগ্ধ করে প্রতিটি প্রকৃতিপ্রেমী মনকে। সড়কের পাশে সারি সারি খেজুরগাছ, গাছিদের রস সংগ্রহের ব্যস্ততা এবং গ্রামীণ উঠানে খেজুরের গুড় তৈরির দৃশ্য শীতের বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলে। মনপুরায় চর জাঁমুয়াল, চর পাতিয়া, চর পিয়াল, চর নিজাম, চর শামসুদ্দিন, দলার চর ও কলাতলির চরের মতো ছোট-বড় অনেকগুলো চর রয়েছে।
শীতকালে এসব চর হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে। এ ছাড়া এই দ্বীপে আছে হরিণের অভয়াশ্রম, মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশন এবং চৌধুরী প্রজেক্ট। মেঘনা নদীর ৫০০ মিটার ভেতরে মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছে। ল্যান্ডিং স্টেশন নদীর বুকে হেঁটে যাওয়ার লম্বা সেতু স্টেশন থেকে সমুদ্রের বাতাস এবং চারপাশের দৃশ্য দারুণ অভিজ্ঞতা দেয়।
শীতের সকালে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা কিংবা বিকেলে সূর্যাস্তের গাঢ় রঙিন আভা উপভোগ করা এখানে ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে পারে। নদীর তীরে জেলেদের মাছ ধরা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম দ্বীপটির নৈসর্গিক রূপের পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা আলোকচিত্রীদের জন্য ছবি তোলার দুর্দান্ত অনুষঙ্গ।
মনপুরার সবুজ ফসলের মাঠ, আঁকাবাঁকা শান্ত পথ ও নদীঘেঁষা জনবসতি ভ্রমণকারীদের সামনে বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ জীবনের অনন্য রূপ তুলে ধরে। শীতকাল মূলত ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় হওয়ায় তুলনামূলক আরামদায়ক আবহাওয়ায় খোলা পরিবেশে সময় কাটানো সহজ হয়। ফলে গাদাগাদি পর্যটনকেন্দ্রের পরিবর্তে যারা শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চান, তাদের কাছে মনপুরার আবেদন ভিন্নধর্মী।
ভৌগোলিক অবস্থান ও রূপবৈচিত্র্যের কারণে মনপুরায় পর্যটনশিল্প বিকাশের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন সঠিক ও পরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যটকবান্ধব সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাত্রা, মানসম্মত আবাসন এবং দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন মনপুরাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি জাতীয় সংসদে বক্তব্য এবং পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর এক সাক্ষাৎকারে চরফ্যাশন ও মনপুরাকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, পরিকল্পিতভাবে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলা সম্ভব হলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত মনপুরাকে সরকার দ্রুত ‘পর্যটন অঞ্চল’ ঘোষণা করলে পরিবেশের সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখেই আন্তর্জাতিক মানের টেকসই পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।





















