সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছেন।
এ নিয়ে বিরোধী দল কথা বললে অন্য একটা খাত থেকে সামান্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাচ্চারা কান্নাকাটি করলে তাদের চকলেট দেওয়া হয়। বিরোধী দলকে চকলেট দিয়ে খুশি করে, আর তারা বিরিয়ানি খায়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাম্প্রতিক বিষয়াবলি নিয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন।
বর্তমান সরকার রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারি দল—এ তিনটি জিনিসকে গুলিয়ে ফেলছে উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি বলেন, বিরোধী দল সরকারের অপকর্মের বিরোধিতা করলে সেটিকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা বলা হচ্ছে। সরকার একদলীয় কর্তৃত্ব খাটিয়ে প্রকারান্তরে নিজেরাই ফ্যাসিবাদকে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নিজেদের দলীয়করণ, ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ঢাকার জন্য সরকার জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।
বিরোধী দল কখনো ফ্যাসিস্টকে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে না; বরং বিরোধী দলের আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে। এই পথ দিয়ে তারাই ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে। গত কয়েক মাসে তিন মন্ত্রী ও এক সংসদ সদস্য বিদায় নেওয়ায় সরকারের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বিরোধী দল জুলাইকে ধারণ করে না—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বলেন, এটা হাস্যকর কথা। মানুষ তার দুর্বলতা ঢাকতে বিভিন্ন কথা বলে, তবে তারও একটা মাত্রা থাকে। জামায়াতসহ ১১ দল জুলাইকে ধারণ করে বলেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলন করছে। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলেই তারা গণভোটকে অস্বীকার করছে।
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি যাননি—প্রধানমন্ত্রীর এমন অভিযোগের বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে কার্ড পাঠিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হলেও কার্ডে ও অতিথি তালিকায় কোথাও তাঁর নাম নেই। তিনি কি সেখানে গিয়ে সাধারণ শ্রোতাদের চেয়ারে বসবেন—এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দল সাহায্য করছে না—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সাহায্য লাগবে কেন। জনগণ গণভোট দিয়েই সংবিধানে জুলাই সনদ অনুমোদন করে দিয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে গণভোটের রায় কার্যকর করতে বিরোধী দল সব ধরনের সাহায্য করতে প্রস্তুত।
কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে একদলীয় কমিটি করে সংস্কার না করে সংবিধান সংশোধন করলে সে অপকর্মে বিরোধী দল সাহায্য করবে না। কর্মীদের কাছে ফেরত যান গত রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ফ্যাসিস্টদের পথ কী, তা জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাছে জানতে চান। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আজ সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিজম চিনেছে আওয়ামী লীগকে দিয়ে।
ফ্যাসিস্ট কী, এ কথা মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব রিজভী ভুলে গেছেন। ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে তাঁকে দলীয় কর্মীদের কাছে ফেরত যেতে হবে। ফ্যাসিস্টের কাজ ওরা বলতে পারবে। চাঁদাবাজি, ধ্বংস, খুন ও লুণ্ঠনই ফ্যাসিবাদের পথ উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের সব পদে নিজ দলের লোক বসানো, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায় উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের লোক।
বিএনপি এখন সেই পথে যাত্রা করছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি জামায়াত ১৯৯৪–৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সঙ্গে একই পথে হেঁটেছে—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সাম্প্রতিক এমন বক্তব্যের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি।
বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মানতে চায়নি, তখন শুধু আওয়ামী লীগ নয়, জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ বিরোধী দলের লিয়াজোঁ কমিটি হয়েছিল। লিয়াজোঁ কমিটি সম্মিলিত কর্মসূচিতে জামায়াতও ছিল। গণবিরোধী অবস্থানের কারণে সেবার বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি। কিন্তু বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল। এটি সত্য নয়। বিএনপির অবস্থানের কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।
দেখা যাক, কার মাহফিলে কত লোক হয় সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য আমির হামজার মাহফিলে লাখ লাখ মানুষ হয়। সেটি ঠেকাতে না পেরে সরকার প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, তাহলে বিএনপি কোরআনের তাফসির আর ওয়াজ মাহফিল শুরু করুক। দেখা যাবে, কার মাহফিলে কত লোক হয়। সরকার যেন এ পথ থেকে ফিরে আসে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত আলিম, ফাজিল, কামিল মাদ্রাসার সব গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটি এক প্রজ্ঞাপনে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এসব মাদ্রাসায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাদ দিয়ে সরকারি নিজস্ব চিন্তার লোকদের দিয়ে সরকার হাজার হাজার মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সৌদির ঘটনা কূটনৈতিক ব্যর্থতা সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সৌদিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূত আছেন।
এ ঘটনায় কূটনৈতিক ব্যর্থতা দেখা গেছে। বিচারের আগে তিনি যখন আসামি হয়েছেন, তখনই বিষয়টি সরকারের নোটিশে আসার কথা ছিল। সরকারের পক্ষে আইনগত পদক্ষেপগুলো নেওয়ার দায়িত্ব ছিল ওই দেশের দূতাবাসের। তারা নিজেরা জানেনি, সরকারকেও জানায়নি। যখন বিচার কার্যকর হয়ে গেছে, তখন সরকারের ঘুম ভেঙেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন ও মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান প্রমুখ।





















