আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৫°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৫০%

সাতক্ষীরায় দেড় লাখ দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় গড়া দুর্গা প্রতিমার কারুকাজ খুলে ফেলা হলো

  • MIT ERP
  • Update Time : 05:03:50 pm, Thursday, 15 October 2026
  • 12

সাতক্ষীরায় দেড় লাখ দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় গড়া দুর্গা প্রতিমার কারুকাজ খুলে ফেলা হলো

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

চারদিকে ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টা আর শাঁখের ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উদ্দীপনায় মেতে ওঠার কথা ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের। কিন্তু উৎসবের ঠিক শুভমুহূর্তে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ব্রহ্মরাজপুর পূজামণ্ডপে নেমে এসেছে গভীর বিষাদ ও চরম হতাশা।

প্রায় দেড় লাখ দেশলাই কাঠি (দিয়াশলাই) ও রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজে তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী দুর্গা প্রতিমার মনোমুগ্ধকর অলংকরণ শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন পূজা কমিটি ও মৃৎশিল্পীরা। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ।

এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিমা থেকে দেশলাই কাঠির অলংকরণ ও কারুকাজ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

অন্যথায় প্রশাসন নিজ উদ্যোগে তা সরিয়ে নেবে বলেও জানানো হয়। প্রশাসনের এমন আকস্মিক ও কঠোর নির্দেশনার পর প্রতিমার মূল কাঠামো অক্ষত রেখে শুধু গায়ে লাগানো দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার কাজগুলো বাধ্য হয়ে ১৪ অক্টোবর রাতেই খুলে ফেলেন শিল্পীরা। স্থানীয়রা জানান, কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম, বিনিদ্র রাত ও নিরলস প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল এই নান্দনিক শিল্পকর্ম।

দেশলাই কাঠি ও সুতার এমন দৃষ্টিনন্দন ও অনন্য শিল্পকর্ম দেখতে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজামণ্ডপ উদ্বোধনের আগেই সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটতে শুরু করেছিল। সরেজমিনে মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অত্যন্ত যত্ন ও মমতায় তৈরি প্রতিমার গায়ে লাগানো কাঠি ও সুতার রঙিন স্তরগুলো কেটে কেটে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

ভারাক্রান্ত মন ও ভেজা চোখে শিল্পীরা নিজেদের হাতে গড়া শিল্পকর্ম নিজেরাই খুলে ফেলছেন। উপস্থিত স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দর্শনার্থীদের চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছে চরম হতাশা ও বেদনার ছাপ। উৎসবের প্রাক্কালে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে স্তব্ধতা। প্রতিমাশিল্পী ও কারিগররা গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে রেশমি সুতা আর দেশলাই কাঠি দিয়ে তিল তিল করে মায়ের এই রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলাম।

আজ যখন দেবী বন্দনার আনন্দের সময়, ঠিক তখনই আমাদের এই শিল্পকর্ম নষ্ট করে ফেলতে হচ্ছে, যা আমাদের বুকে তীরের মতো বিঁধছে। যদি কোনো অগ্নিনিরাপত্তা বা সার্বিক ঝুঁকি থেকেই থাকত, তবে কাজ শুরুর প্রথম দিনেই আমাদের সতর্ক করা উচিত ছিল। এত দিন পর পূজার আগমুহূর্তে এসে এমন সিদ্ধান্তে আমরা বাক্‌রুদ্ধ। অন্যদিকে, পূজা উদ্‌যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, নিরাপত্তার বিষয়টিকে তারা শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরামর্শ মেনেই দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমাগুলো আকর্ষণীয় করে সাজানো হয়েছিল। পাশাপাশি, মণ্ডপে পর্যাপ্ত বালু, পানি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো ঘটনার সার্বিক দায়ভার নেওয়ার অঙ্গীকার করে প্রশাসনের কাছে লিখিত অঙ্গীকারনামাও জমা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এত নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত উৎসবের পুরো আমেজ ম্লান করে দিয়েছে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা তৈরির উদ্যোগটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্রহ্মরাজপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন না আসায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে এখন কেবলই বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস বিরাজ করছে। প্রতিমার গায়ে থেকে দেয়াশলাই কাঠি সরিয়ে নিচ্ছেন শিল্পীরা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

দুর্গাপূজায় বিশেষ সার্ভিসের জন্য প্রস্তুত বিআরটিসির ২০০ বাস

সাতক্ষীরায় দেড় লাখ দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতায় গড়া দুর্গা প্রতিমার কারুকাজ খুলে ফেলা হলো

Update Time : 05:03:50 pm, Thursday, 15 October 2026

চারদিকে ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টা আর শাঁখের ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উদ্দীপনায় মেতে ওঠার কথা ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের। কিন্তু উৎসবের ঠিক শুভমুহূর্তে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ব্রহ্মরাজপুর পূজামণ্ডপে নেমে এসেছে গভীর বিষাদ ও চরম হতাশা।

প্রায় দেড় লাখ দেশলাই কাঠি (দিয়াশলাই) ও রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজে তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী দুর্গা প্রতিমার মনোমুগ্ধকর অলংকরণ শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন পূজা কমিটি ও মৃৎশিল্পীরা। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ।

এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিমা থেকে দেশলাই কাঠির অলংকরণ ও কারুকাজ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।

অন্যথায় প্রশাসন নিজ উদ্যোগে তা সরিয়ে নেবে বলেও জানানো হয়। প্রশাসনের এমন আকস্মিক ও কঠোর নির্দেশনার পর প্রতিমার মূল কাঠামো অক্ষত রেখে শুধু গায়ে লাগানো দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার কাজগুলো বাধ্য হয়ে ১৪ অক্টোবর রাতেই খুলে ফেলেন শিল্পীরা। স্থানীয়রা জানান, কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম, বিনিদ্র রাত ও নিরলস প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল এই নান্দনিক শিল্পকর্ম।

দেশলাই কাঠি ও সুতার এমন দৃষ্টিনন্দন ও অনন্য শিল্পকর্ম দেখতে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজামণ্ডপ উদ্বোধনের আগেই সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটতে শুরু করেছিল। সরেজমিনে মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অত্যন্ত যত্ন ও মমতায় তৈরি প্রতিমার গায়ে লাগানো কাঠি ও সুতার রঙিন স্তরগুলো কেটে কেটে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

ভারাক্রান্ত মন ও ভেজা চোখে শিল্পীরা নিজেদের হাতে গড়া শিল্পকর্ম নিজেরাই খুলে ফেলছেন। উপস্থিত স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দর্শনার্থীদের চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছে চরম হতাশা ও বেদনার ছাপ। উৎসবের প্রাক্কালে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে স্তব্ধতা। প্রতিমাশিল্পী ও কারিগররা গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে রেশমি সুতা আর দেশলাই কাঠি দিয়ে তিল তিল করে মায়ের এই রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলাম।

আজ যখন দেবী বন্দনার আনন্দের সময়, ঠিক তখনই আমাদের এই শিল্পকর্ম নষ্ট করে ফেলতে হচ্ছে, যা আমাদের বুকে তীরের মতো বিঁধছে। যদি কোনো অগ্নিনিরাপত্তা বা সার্বিক ঝুঁকি থেকেই থাকত, তবে কাজ শুরুর প্রথম দিনেই আমাদের সতর্ক করা উচিত ছিল। এত দিন পর পূজার আগমুহূর্তে এসে এমন সিদ্ধান্তে আমরা বাক্‌রুদ্ধ। অন্যদিকে, পূজা উদ্‌যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, নিরাপত্তার বিষয়টিকে তারা শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরামর্শ মেনেই দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমাগুলো আকর্ষণীয় করে সাজানো হয়েছিল। পাশাপাশি, মণ্ডপে পর্যাপ্ত বালু, পানি ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো ঘটনার সার্বিক দায়ভার নেওয়ার অঙ্গীকার করে প্রশাসনের কাছে লিখিত অঙ্গীকারনামাও জমা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এত নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত উৎসবের পুরো আমেজ ম্লান করে দিয়েছে। ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা তৈরির উদ্যোগটি হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্রহ্মরাজপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন না আসায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে এখন কেবলই বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস বিরাজ করছে। প্রতিমার গায়ে থেকে দেয়াশলাই কাঠি সরিয়ে নিচ্ছেন শিল্পীরা।