বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতেও এসেছে নানা রদবদল।
প্রতিবারই নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। মানুষ ভেবেছে, এবার হয়তো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর হবে, প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে, অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় হারাবে এবং সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের পর একই ধরনের অভিযোগ আবার সামনে এলে একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না ক্ষমতার পরিবর্তন কি সত্যিই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে পেরেছে?
প্রশ্নটি শুধু কোনো একটি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ সরকার পরিবর্তন মানেই রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে, মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হতে পারে, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের পুরোনো পদ্ধতি যদি বহাল থাকে, তাহলে পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কতটা?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা বারবার আলোচনায় এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ, বাজার, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোয় নতুন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। আগের পক্ষের কিছু মানুষ প্রভাব হারান, নতুন পক্ষের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন।
কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা এবং প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা সুবিধা তৈরির সংস্কৃতি যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে পরিবর্তনটি কতটা মৌলিক সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্ষমতার মালিক বদল, নাকি ক্ষমতার ব্যবহারে পরিবর্তন? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে, ক্ষমতা হারাবে, আবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরেও আসতে পারে।
এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে থানায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে পারেন, সরকারি কাজের দরপত্রে সুবিধা পেতে পারেন কিংবা ভূমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েও আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন।
এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে যদি কেউ আইন এড়িয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের বিষয় থাকে না; রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর জন্যও তা গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো অপরাধের দায়মুক্তি দিতে পারে না। একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধী প্রমাণ করে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের অধিকার ও দায় নির্ধারিত হবে আইন, প্রমাণ এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অথচ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনেক সময় বিচারটি প্রমাণের আগেই দলীয় অবস্থান অনুযায়ী শুরু হয়ে যায়। কেউ অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেন, কেউ আবার অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
এই প্রবণতা বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ অপরাধের বিচার যখন দলীয় সমর্থন ও বিরোধিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের অধিকার রক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
অপরাধের পরিসংখ্যান ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কতটা হয়েছে, তা বোঝার অন্যতম উপায় হলো সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছেন এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে, তা পর্যালোচনা করা। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য জাতীয় সংসদে তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এ সময়ে দেশে ২ হাজার ৩৩২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪০২টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৩৪৭টি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব অপরাধের কয়েকটি সূচকে হ্রাসের তথ্যও তিনি তুলে ধরেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬০৭টি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের একই সময়ে নথিভুক্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২৭৫টি কমেছে।
সূত্র: ডেইলি সান। এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। অপরাধের সংখ্যা কমে আসা অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু শুধু সংখ্যার পরিবর্তন দিয়ে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার অভিজ্ঞতা, মামলার তদন্তের মান, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার হার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ওধিকার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত ও ৯৭০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে ওই সময়ে মব সহিংসতায় ৩৩ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার। এসব তথ্যের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে পরিসংখ্যানগুলো একটি বৃহত্তর আলোচনার অবকাশ তৈরি করে: রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর?
অপরাধের সংখ্যা কমলেও যদি মানুষ মনে করেন যে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া কঠিন, তাহলে আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়। এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়া নয়; বরং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে নাগরিকের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। কেউ যদি ভাবেন, ‘অভিযোগ করে লাভ নেই’, ‘অভিযুক্তের রাজনৈতিক লোক আছে’, ‘মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না’ তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর আইনের প্রতি আস্থা হারানো নাগরিক যখন বিচার পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে অন্য পথ খুঁজতে শুরু করেন, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মব সহিংসতা: রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য সতর্কবার্তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, কাউকে গণপিটুনি দেওয়া, সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যা করা কিংবা জনতার বিচারে শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে মব সহিংসতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা জননিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নকে সামনে আনে। ওধিকারের পর্যবেক্ষণে চুরি-ডাকাতির সন্দেহ, অনানুষ্ঠানিক সালিশ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে সংঘটিত হামলায় মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার। এ ধরনের ঘটনায় অপরাধের অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার।
কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজেদের বিচারক ও শাস্তিদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে শাস্তি দেওয়া হলে নিরপরাধ মানুষের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো দলের নেতা বা কর্মী মব সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। আবার কোনো ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলে সেটিকে রাজনৈতিক রং দেওয়াও অনুচিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধের বিচার বিলম্বিত হলে কিংবা তদন্তের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেলে প্রতিশোধমূলক আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার পথও আইনসম্মত হতে হবে। জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে কোনো রাষ্ট্র স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় যখন ব্যক্তিগত সুবিধার হাতিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এর প্রকাশ ঘটতে পারে বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, পরিবহণ বা বাজারে আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, সরকারি কাজের দরপত্রে প্রভাব বিস্তার কিংবা স্থানীয় বিরোধে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টায়। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া অপরাধের প্রমাণ নয়। আবার কোনো ব্যক্তি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে তাঁর পরিচয়ের কারণে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্যক্তি, সংগঠন এবং অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে শুধু বিরোধী পক্ষের প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে দলীয় অবস্থান রক্ষাই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংগঠনের ভেতরে জবাবদিহির সুযোগ সংকুচিত হয়।
রাজনৈতিক দলের উচিত নিজেদের জন্য স্পষ্ট আচরণবিধি তৈরি করা। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাংগঠনিক দায়িত্ব সাময়িকভাবে স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না।
চূড়ান্তভাবে অপরাধ প্রমাণিত হলে দলীয় শাস্তির পাশাপাশি আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা শুধু বিরোধী মত দমন করার জন্য নয়; নিজের দলের ক্ষমতাবান সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য ব্যবহৃত হতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক সংগঠন জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রশাসন কি জনগণের, নাকি ক্ষমতাবানদের? রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো প্রশাসন। নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি সেবা, আইনশৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে। ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো প্রশাসনকে এককভাবে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে।
সংস্থাটি রাজনৈতিক নিয়োগ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার। সেপ্টেম্বরেও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও স্বাধীন করার পরিবর্তে রাজনৈতিকীকরণের অভিযোগ তোলেন। এটি সংস্থাটির মূল্যায়ন ও অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রকৃতি ও যৌক্তিকতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। এই আলোচনার মূল প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন তাঁর পদোন্নতি, বদলি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাহলে তিনি কার কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন? জনগণের কাছে, নাকি ক্ষমতাবানদের কাছে? একটি কার্যকর প্রশাসনকে রাজনৈতিক সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু বেআইনি নির্দেশ পালন করা তার দায়িত্ব হতে পারে না।
সরকারের বৈধ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার এই দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। এ জন্য নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ মানদণ্ড, বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ এবং অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ তুলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেমন থাকা উচিত নয়, তেমনি রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে পেশাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার অর্থ রাজনৈতিক সরকারের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইন ও বিধি অনুযায়ী কাজ করবে এবং নাগরিকদের সঙ্গে আচরণে বৈষম্য করবে না। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় আস্থা ফিরবে কীভাবে? রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা গড়ে ওঠে মূলত তিনটি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিপদে নিরাপত্তা পাওয়া, অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার পাওয়া এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ হতে দেখা।
এ তিনটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, তদন্তে গড়িমসি কিংবা অপরাধীর প্রতি নমনীয়তার অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একইভাবে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি, প্রতিহিংসামূলক মামলা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করাও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে সংস্কারের অর্থ শুধু কর্মকর্তা বদলানো নয়। একজন কর্মকর্তার পরিবর্তে অন্যজন দায়িত্ব নিলেই যদি একই ধরনের অনিয়মের সুযোগ থাকে, তাহলে কাঠামোগত সমস্যা থেকেই যাবে।
প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে অভিযোগ গ্রহণ থেকে তদন্তের অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনাযোগ্য হবে। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তিও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।
ফলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি ন্যায়বিচারের মান বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। আইনের প্রয়োগ হতে হবে অপরাধের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একই অপরাধে একই আইনি মানদণ্ড প্রযোজ্য না হলে নাগরিকের মনে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হবে। আর বৈষম্যের এই অনুভূতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করতে পারে। ব্যবসা, বাজার ও ভূমিতে প্রভাবের রাজনীতি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় শুধু জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা কিংবা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দিকে তাকালে চলবে না।
স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ক্ষমতার প্রভাব কতটা রয়েছে, তা বিবেচনা করতে হবে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি দোকান পরিচালনার জন্য নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার চাপে থাকেন, কোনো পরিবহণশ্রমিক যদি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুমতি ছাড়া কাজ করতে না পারেন, কোনো কৃষক যদি জমির অধিকার রক্ষায় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পান কিংবা কোনো ঠিকাদার যদি কাজ পেতে রাজনৈতিক যোগাযোগকে অপরিহার্য মনে করেন, তাহলে সেই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়।
এটি নাগরিক অধিকার ও সমান সুযোগের প্রশ্ন। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। তবে অভিযোগের তদন্তে রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, ভূমি অফিস, বাজার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে অনিয়মের বিরুদ্ধে মানুষের কথা বলার সাহস বাড়তে পারে।
সরকারি কাজের দরপত্রে স্বচ্ছতা, ভূমি রেকর্ডের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক অনুমোদনের নির্দিষ্ট নিয়ম এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা গেলে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমানো সম্ভব। এসব পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য নয়; রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। এখানে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখলদারি বা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজে লাগাতে না পারেন, সে বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বের স্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন। নাগরিক সমাজের নীরবতা ও দলীয় অন্ধ আনুগত্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কেবল সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না।
নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের আচরণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন ব্যক্তি নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতেই পারেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে অবস্থান নেওয়াও নাগরিক অধিকার। কিন্তু দলীয় সমর্থনের কারণে অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করা, প্রমাণ ছাড়াই বিরোধী পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করা কিংবা নিজের দলের অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।
অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখে তার কাজের মূল্যায়ন করলে ন্যায়বিচারের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই ধরনের অপরাধে এক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে নীরবতা বজায় রাখলে রাজনৈতিক নৈতিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাও কমে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। যাচাইহীন তথ্য, গুজব, সম্পাদিত ভিডিও কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারেন, সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তদন্তের আগেই জনমত প্রভাবিত হতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার এবং অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা জরুরি। গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন অনুসন্ধান করতে হবে, তেমনি বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগও একই পেশাগত মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।
রাজনৈতিক চাপ, বিজ্ঞাপননির্ভরতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেন সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের অধিকার নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষারও একটি শর্ত। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান শেখানোর প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি শুধু সংসদে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় পরিবার, শ্রেণিকক্ষ, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগের প্রতিটি স্তরে। পরিবর্তনের জন্য কী করা প্রয়োজন? রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চাইলে প্রথমেই প্রয়োজন ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, পুলিশ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
এই নীতিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। প্রথমত, অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগকারী যে রাজনৈতিক দলেরই হোন এবং অভিযুক্ত যে পরিচয়েরই হোন, তদন্তের মানদণ্ড একই থাকতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রভাবমুক্তভাবে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে জবাবদিহির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দলীয় পদ, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য যেন অপরাধের দায় এড়ানোর উপায় না হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং নিরপেক্ষতাকে মূল্যায়নের ভিত্তি করতে হবে।
নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের অভিযোগে কার্যকর তদন্তের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। চতুর্থত, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। মামলার জট কমানো, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিচার যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, আবার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অপরাধীরাও যেন দায়মুক্তি না পায়।
পঞ্চমত, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ মোকাবিলায় কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকেরা যেন ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন এবং অভিযোগের ফলাফল সম্পর্কে জানতে পারেন, সে নিশ্চয়তা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অনুসন্ধান করার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও তথ্যের নির্ভুলতা এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি। সপ্তমত, সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সূচক তৈরি করা যেতে পারে। শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো কিংবা কতজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হলো, তা দিয়ে সংস্কারের সাফল্য নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়। কতটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হয়েছে, কতটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, সরকারি সেবায় বৈষম্য কমেছে কি না এবং নাগরিকেরা প্রতিকার পাচ্ছেন কি না এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা বদলায়। নতুন নেতৃত্বের কাছে নাগরিকেরা নতুন সম্ভাবনা দেখতে চান। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণের জন্য শুধু নতুন মুখ, নতুন স্লোগান কিংবা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন। আগের সরকারের সময় কোনো অনিয়ম ঘটলে নতুন সরকারের দায়িত্ব সেটি তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
কিন্তু একই ধরনের অনিয়ম নতুন করে ঘটলে শুধু অতীতের ব্যর্থতার কথা বলে দায় এড়ানো যায় না। ক্ষমতায় থাকা মানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করার দায়িত্ব গ্রহণ করা। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জনসম্পদ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়নি।
এগুলোর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হলো জনগণের অধিকার রক্ষা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের ভুলের সমালোচনা করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও দায়িত্ব। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন প্রতিহিংসা, গুজব কিংবা সহিংসতার দিকে না যায়, সে বিষয়ে সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালনা করা। কারণ ব্যক্তির সদিচ্ছা দিয়ে কিছু পরিবর্তন সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও নাগরিকের অধিকার বদলে যাবে না; রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও আইনের প্রয়োগ বদলাবে না; আর ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত থেমে যাবে না।
শেষ কথা হলো, ক্ষমতার পরিবর্তন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে; কিন্তু সেই পরিবর্তন নিশ্চিত করে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত পরিবর্তন তখনই ঘটবে, যখন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষই আইনের শাসন মেনে চলবে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অপরাধী সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনবে, প্রশাসন পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে এবং সাধারণ মানুষ দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ন্যায়বিচার পাবেন।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কে ক্ষমতায় আছে, তা নয়; বরং ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কাদের স্বার্থে কাজ করছে, তা নির্ধারণ করা। সরকার বদলেছে এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগের মধ্যে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এখনো অসম্পূর্ণ।
রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য ক্ষমতাবানদের সুবিধা বাড়ানোর মধ্যে নয়; বরং ক্ষমতাহীন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজ সব পক্ষকেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরে নয়, ক্ষমতাকে নিয়মের মধ্যে রাখার সক্ষমতায়।





















