আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৬°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪৮%

রাজধানীতে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহারে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:23:51 am, Thursday, 15 October 2026
  • 15

রাজধানীতে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহারে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাত ১০টা। দিনের ব্যস্ততা কমে এলেও রাজধানীর রায়েরবাজারের একটি সরু গলির টিনশেড ঘরে তখন অন্য ব্যস্ততা। সারি সারি ব্যাটারিচালিত রিকশা। একটির পর একটি ব্যাটারি বসানো হচ্ছে চার্জে। কোথাও নেই বৈধ চার্জিং স্টেশনের সাইনবোর্ড।

কোনো কোনো গ্যারেজে বাণিজ্যিক চার্জিংয়ের পরিবর্তে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার সংযোগের বৈধতা ও অনুমোদিত লোড নিয়েও প্রশ্ন। রাতভর চার্জ শেষে ভোরে এসব রিকশা বেরিয়ে পড়বে রাজধানীর সড়কে। যাত্রী পরিবহন করে আয় করেন চালক ও মালিকেরা। কিন্তু ব্যাটারিতে জমা হওয়া বিদ্যুতের কতটা বৈধ সংযোগে নেওয়া হচ্ছে; কতটা অবৈধ সংযোগ কিংবা অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত লোডে।

এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে। বিষয়টি এখন আর কয়েকটি গ্যারেজের অনিয়মে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সরকারি রাজস্ব, বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা ও নগর অর্থনীতির বড় একটি অংশ। দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রকৃত পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সংখ্যা অন্তত ৮০ লাখ।

সরকারি হিসাবে এসব যান চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। রাজধানীর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে ডিএমপির করা এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, শুধু ঢাকায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টি এবং ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে মিরপুর বিভাগের সাত থানায় ৩ হাজার ৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি গ্যারেজের তথ্য রয়েছে। ওয়ারী বিভাগে রয়েছে ৩ হাজার ৫১৬টি চার্জিং পয়েন্ট ও ১৩৬টি গ্যারেজ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এই বিশাল ব্যবধান চার্জিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতা সামনে এনেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা দিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ চুরির পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজে একসঙ্গে পার্কিং, ব্যাটারি চার্জ ও মেরামতের কাজ চলছে। মিরপুরের শাহ আলী ও বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় কোনো কোনো গ্যারেজে ৮০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত রিকশা রাখা হয়।

এসব গ্যারেজে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চার্জিংয়ের বিদ্যুতের চাহিদা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে, দেশের ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চার্জ দিতে আনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।

এটি জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমপরিমাণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিপিডিসির অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনগুলোতে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৬ দশমিক ১৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। সূত্রমতে, বৈধ স্টেশনগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখা সম্ভব হলেও বিপুলসংখ্যক অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের প্রকৃত ব্যবহার নিরূপণ কঠিন।

সেই তথ্য বিতরণকারী সংস্থার হিসাব থেকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। বিদ্যুৎ চুরির ক্ষেত্রে সাধারণত খুঁটি থেকে সরাসরি তার টেনে সংযোগ নেওয়ার চিত্র সামনে আসে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিংয়ের অনিয়ম একাধিক ধরনের হতে পারে। কোথাও বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়া হয়। কোথাও বৈধ সংযোগ থাকলেও অনুমোদিত লোড অতিক্রম করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়।

আবার কোনো কোনো গ্যারেজে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক চার্জিং কার্যক্রম চালানো হয়। এই তিন ধরনের অনিয়মের আইনগত ও আর্থিক দিক এক নয়। মিরপুরের একটি গ্যারেজের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম জানান, তার গ্যারেজে প্রতিদিন বিদ্যুতের খরচ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এই ব্যয়ের মধ্যে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় এবং সংযোগটি কোন শ্রেণির, তা জানা গেলে গ্যারেজটির প্রকৃত চার্জিং ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

মিরপুরের রূপনগর সার্কেলের ডেসকোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাহাদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের অভিযোগ পেলে অভিযান চালানো হয়। অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে জরিমানা করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সম্প্রতি রায়েরবাজার-মোহাম্মদপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সাতটি গ্যারেজে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে পাঁচটিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া গত আগস্টে মিরপুর এলাকায় ডিএমপি ও ডেসকোর যৌথ অভিযানে ৭০টি ব্যাটারি জব্দ এবং ২৫টি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ২০২৫ সালে ডিএনসিসি ও ডিএমপির বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্যেও মিরপুরের একাধিক বড় টিনশেড গ্যারেজে ৮০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত অটোরিকশা রাখার চিত্র উঠে আসে। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের কিছু গ্যারেজে আবাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্যারেজকেন্দ্রিক টাকা আদায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অসাধু কর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রমতে, চলতি বছরের জুন থেকে কার্যকর নতুন ট্যারিফ কাঠামোয় ইলেকট্রিক ভেহিকল ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা। বৈধ চার্জিং স্টেশনে মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব ও নির্ধারিত হারে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে।

কিন্তু আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক চার্জিং পরিচালিত হলে বিদ্যুৎ বিলে বড় রকমের একটি ঘাপলা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার নিয়মিত পরিদর্শন, মিটার যাচাই এবং সংযোগের শ্রেণি অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর পুনরায় সংযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক কাজী নজমুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিম্নমানের তার, অনিরাপদ চার্জার এবং অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত লোড একসঙ্গে থাকলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার সরু গলিতে গ্যারেজ পরিচালিত হলে আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবের মতে, অবৈধ চার্জিং নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চার্জিং স্টেশন নিবন্ধনের আওতায় আনা, প্রতিটি স্থাপনার বিদ্যুৎ সংযোগ ও অনুমোদিত লোডের তথ্য সংরক্ষণ, মিটারভিত্তিক ব্যবহার পরিমাপ এবং নিয়মিত বিল যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। কোন স্থানে গ্যারেজ পরিচালনা করা হচ্ছে, কতটি রিকশা চার্জ হচ্ছে, সেখানে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হচ্ছে কি না— এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং গ্যারেজ মালিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে একদিকে বিদ্যুতের ব্যবহার পরিমাপ ও বিল আদায় সহজ হবে, অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিত চার্জিংয়ের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

শ্রীমঙ্গলে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

রাজধানীতে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহারে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

Update Time : 03:23:51 am, Thursday, 15 October 2026

রাত ১০টা। দিনের ব্যস্ততা কমে এলেও রাজধানীর রায়েরবাজারের একটি সরু গলির টিনশেড ঘরে তখন অন্য ব্যস্ততা। সারি সারি ব্যাটারিচালিত রিকশা। একটির পর একটি ব্যাটারি বসানো হচ্ছে চার্জে। কোথাও নেই বৈধ চার্জিং স্টেশনের সাইনবোর্ড।

কোনো কোনো গ্যারেজে বাণিজ্যিক চার্জিংয়ের পরিবর্তে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার সংযোগের বৈধতা ও অনুমোদিত লোড নিয়েও প্রশ্ন। রাতভর চার্জ শেষে ভোরে এসব রিকশা বেরিয়ে পড়বে রাজধানীর সড়কে। যাত্রী পরিবহন করে আয় করেন চালক ও মালিকেরা। কিন্তু ব্যাটারিতে জমা হওয়া বিদ্যুতের কতটা বৈধ সংযোগে নেওয়া হচ্ছে; কতটা অবৈধ সংযোগ কিংবা অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত লোডে।

এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে। বিষয়টি এখন আর কয়েকটি গ্যারেজের অনিয়মে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সরকারি রাজস্ব, বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা ও নগর অর্থনীতির বড় একটি অংশ। দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রকৃত পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সংখ্যা অন্তত ৮০ লাখ।

সরকারি হিসাবে এসব যান চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। রাজধানীর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে ডিএমপির করা এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, শুধু ঢাকায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টি এবং ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে মিরপুর বিভাগের সাত থানায় ৩ হাজার ৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি গ্যারেজের তথ্য রয়েছে। ওয়ারী বিভাগে রয়েছে ৩ হাজার ৫১৬টি চার্জিং পয়েন্ট ও ১৩৬টি গ্যারেজ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এই বিশাল ব্যবধান চার্জিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতা সামনে এনেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা দিয়ে সরাসরি বিদ্যুৎ চুরির পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজে একসঙ্গে পার্কিং, ব্যাটারি চার্জ ও মেরামতের কাজ চলছে। মিরপুরের শাহ আলী ও বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় কোনো কোনো গ্যারেজে ৮০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত রিকশা রাখা হয়।

এসব গ্যারেজে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চার্জিংয়ের বিদ্যুতের চাহিদা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে, দেশের ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চার্জ দিতে আনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।

এটি জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমপরিমাণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিপিডিসির অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনগুলোতে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৬ দশমিক ১৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। সূত্রমতে, বৈধ স্টেশনগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখা সম্ভব হলেও বিপুলসংখ্যক অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের প্রকৃত ব্যবহার নিরূপণ কঠিন।

সেই তথ্য বিতরণকারী সংস্থার হিসাব থেকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। বিদ্যুৎ চুরির ক্ষেত্রে সাধারণত খুঁটি থেকে সরাসরি তার টেনে সংযোগ নেওয়ার চিত্র সামনে আসে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিংয়ের অনিয়ম একাধিক ধরনের হতে পারে। কোথাও বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়া হয়। কোথাও বৈধ সংযোগ থাকলেও অনুমোদিত লোড অতিক্রম করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়।

আবার কোনো কোনো গ্যারেজে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক চার্জিং কার্যক্রম চালানো হয়। এই তিন ধরনের অনিয়মের আইনগত ও আর্থিক দিক এক নয়। মিরপুরের একটি গ্যারেজের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম জানান, তার গ্যারেজে প্রতিদিন বিদ্যুতের খরচ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এই ব্যয়ের মধ্যে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় এবং সংযোগটি কোন শ্রেণির, তা জানা গেলে গ্যারেজটির প্রকৃত চার্জিং ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

মিরপুরের রূপনগর সার্কেলের ডেসকোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাহাদুল ইসলাম বলেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের অভিযোগ পেলে অভিযান চালানো হয়। অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে জরিমানা করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সম্প্রতি রায়েরবাজার-মোহাম্মদপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সাতটি গ্যারেজে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে পাঁচটিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া গত আগস্টে মিরপুর এলাকায় ডিএমপি ও ডেসকোর যৌথ অভিযানে ৭০টি ব্যাটারি জব্দ এবং ২৫টি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ২০২৫ সালে ডিএনসিসি ও ডিএমপির বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্যেও মিরপুরের একাধিক বড় টিনশেড গ্যারেজে ৮০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত অটোরিকশা রাখার চিত্র উঠে আসে। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের কিছু গ্যারেজে আবাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্যারেজকেন্দ্রিক টাকা আদায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অসাধু কর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রমতে, চলতি বছরের জুন থেকে কার্যকর নতুন ট্যারিফ কাঠামোয় ইলেকট্রিক ভেহিকল ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা। বৈধ চার্জিং স্টেশনে মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব ও নির্ধারিত হারে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে।

কিন্তু আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক চার্জিং পরিচালিত হলে বিদ্যুৎ বিলে বড় রকমের একটি ঘাপলা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার নিয়মিত পরিদর্শন, মিটার যাচাই এবং সংযোগের শ্রেণি অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর পুনরায় সংযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক কাজী নজমুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিম্নমানের তার, অনিরাপদ চার্জার এবং অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত লোড একসঙ্গে থাকলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার সরু গলিতে গ্যারেজ পরিচালিত হলে আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবের মতে, অবৈধ চার্জিং নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চার্জিং স্টেশন নিবন্ধনের আওতায় আনা, প্রতিটি স্থাপনার বিদ্যুৎ সংযোগ ও অনুমোদিত লোডের তথ্য সংরক্ষণ, মিটারভিত্তিক ব্যবহার পরিমাপ এবং নিয়মিত বিল যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। কোন স্থানে গ্যারেজ পরিচালনা করা হচ্ছে, কতটি রিকশা চার্জ হচ্ছে, সেখানে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা হচ্ছে কি না— এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।

এ জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং গ্যারেজ মালিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে একদিকে বিদ্যুতের ব্যবহার পরিমাপ ও বিল আদায় সহজ হবে, অন্যদিকে আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিত চার্জিংয়ের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।