আজ মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
২৮ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৭°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ২%

লোকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৈরি রিকশার ভয়ংকর মরণফাঁদ ও দুর্ঘটনা

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:35:48 pm, Tuesday, 13 October 2026
  • 9

লোকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৈরি রিকশার ভয়ংকর মরণফাঁদ ও দুর্ঘটনা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি ব্যাটারি রিকশার ধাক্কা। কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা। অথচ তাতেই বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবন। কেউ হারান হাত-পা, কেউ মাসের পর মাস পড়ে থাকেন হাসপাতালের বিছানায়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হন স্বজনরা।

কারো জীবনে দুর্ঘটনার পর শুরু হয় দীর্ঘ পঙ্গুত্বের অধ্যায়। বৃদ্ধ রওশন আলীর জীবনেও নেমে এসেছে এমন দুর্বিষহ পরিণতি। একসময় ছিলেন ব্যবসায়ী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বজনদের ভরসা হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। চিকিৎসার পেছনে সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু ব্যয় করেও ফিরে পাননি স্বাভাবিক জীবন।

একসময়ের সচ্ছল এই ব্যবসায়ী বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে, এখন আমি পথের ভিখারি। শুধু রওশন আলী নন, ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন নানা বয়সি মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিশু, কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্করা। পাঁচ বছরের শিশু কামরাঙ্গীরচরের আবদুল্লাহও এমন এক দুর্ঘটনার শিকার। রাস্তা পার হওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় সে।

খাবার কেনার জন্য রাস্তার পাশের দোকানে যাওয়ার সময় ঘটে এ দুর্ঘটনা। শিশুটির বাবা জানান, ছেলেকে নিয়ে দোকানে যাওয়ার সময় একটি অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই আনন্দময় সময় পরিণত হয় আতঙ্কে। একটি দুর্ঘটনা শুধু শরীরে আঘাত করে না, থামিয়ে দেয় পরিবারের আয়-রোজগারও। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ভবিষ্যৎ। অথচ এসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে যানটির নির্মাণমান, ব্রেকিং ব্যবস্থা ও কারিগরি নিরাপত্তা কতটা যাচাই করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে আড়ালেই।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু চালকের বেপরোয়া গতি কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় গ্যারেজে রিকশা তৈরি ও রূপান্তরের পদ্ধতি নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচলিত প্যাডেলচালিত রিকশাকে পরিবর্তন করে ব্যাটারিচালিত রিকশায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও নতুন চেসিস তৈরি হচ্ছে, কোথাও পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে মোটর, ব্যাটারি, কন্ট্রোলার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ।

কিন্তু যে কাঠামো মানুষের পায়ের শক্তিতে তুলনামূলক ধীরগতিতে চলার জন্য তৈরি, সেটি মোটরের শক্তি ও অতিরিক্ত ওজন বহনের উপযোগী করে প্রকৌশলসম্মতভাবে পুনর্নকশা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় এসব যান তৈরির সঙ্গে যুক্ত মেকানিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্যারেজের কারিগরি অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই মোটর, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বসানো হয়।

কোথায় ওয়েল্ডিং হবে, কীভাবে বডি বসবে, কত শক্তির মোটর লাগানো হবে, সেসব সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় ইচ্ছামতো। রায়েরবাজার এলাকার একজন মেকানিকের ভাষ্য, ইঞ্জিনিয়ার লাগে না, চোখের আন্দাজে ঝালাই করি। কাস্টমার সস্তায় চায়, আমরাও সেভাবেই বানাই। ওই মেকানিকের দাবি, মোটরের শক্তি বাড়লে পুরোনো ব্রেক দিয়ে যান নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। দ্রুতগতিতে হঠাৎ ব্রেক করলে চাকা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

জানা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তায় ব্রেক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোটরচালিত হওয়ায় এসব যান দ্রুতগতি তুলতে পারে। একই সঙ্গে চালক, যাত্রী, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের সম্মিলিত ওজন বহন করতে হয়। ফলে যানটির গতি ও মোট ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রেকিং ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে জরুরি মুহূর্তে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, এসব যান নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন পর্যায় থেকেই নজরদারি প্রয়োজন। চালক, মালিক কিংবা মেকানিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিগতভাবে এসব যান তৈরি করতে হবে। সর্বোচ্চ গতি সীমিত রাখার ব্যবস্থাও করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারে সীমিত রাখার ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত। কারণ সরু সড়কে দ্রুতগতির যান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রকৌশলসম্মত যান তৈরিতে শুধু মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করলেই চলে না। চেসিসের শক্তি, স্টিয়ারিং, টায়ার, সাসপেনশন, ব্রেক এবং ওজনের বণ্টন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।

ব্যাটারি কোথায় বসানো হয়েছে, ভারকেন্দ্র কতটা উঁচুতে, বাঁক নেওয়ার সময় যানটি কতটা স্থিতিশীল থাকে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশলগত গবেষণায় নিরাপদ ই-রিকশার নকশা মূল্যায়নে ব্রেকিং দূরত্ব, ভারকেন্দ্র, কাঠামোগত শক্তি ও স্থিতিশীলতার মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। একটি গবেষণায় ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে ১০ মিটারের মধ্যে থামার সক্ষমতাকে নকশাগত বেঞ্চমার্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, রাজধানীর গ্যারেজে তৈরি বা রূপান্তর করা রিকশাগুলোর জরুরি ব্রেকিং পরীক্ষা হয় কি না। হলে সেই পরীক্ষার মানদণ্ড কী, ফলাফল কে সংরক্ষণ করে এবং পরীক্ষায় ব্যর্থ যানকে সড়কে নামা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা আছে কি না। তিন চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে ব্রেকের পাশাপাশি বাঁক নেওয়ার সময় স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। গতি বাড়ার সঙ্গে বাঁক নেওয়ার সময় পার্শ্বীয় বল বাড়ে।

কাঠামো দুর্বল হলে, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ উঁচুতে বসানো হলে কিংবা ওজনের বণ্টন অসম হলে দ্রুত বাঁক নেওয়ার সময় যানটি কাত হয়ে পড়া বা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই নিরাপদ যান নির্মাণে ভারকেন্দ্র, স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত শক্তি ও ব্রেকিং পারফরম্যান্স পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে তৈরি বা রূপান্তর করা যানগুলোর ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে কি না, তার সুস্পষ্ট তথ্য জরুরি।

দুর্ঘটনার পর তদন্তেও বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যানটির ব্রেক ঠিকমতো কাজ করেছিল কি না, চেসিসে ফাটল বা দুর্বল ওয়েল্ডিং ছিল কি না, টায়ারের মান কেমন, ব্যাটারি ও যাত্রীদের ওজনের ভারসাম্য ঠিক ছিল কি না, স্টিয়ারিংয়ে ত্রুটি ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্যাডেলচালিত রিকশার চালকদের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ গুরুতর থেকে অত্যন্ত গুরুতর দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানান। প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ৬ মে কামরাঙ্গীরচরে বাড়ির সামনে খেলতে থাকা পাঁচ বছরের এক শিশুকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ধাক্কা দিলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ১৮ জুলাই দক্ষিণখানে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার পর ১৭ বছর বয়সি এক কিশোর গুরুতর আহত হয়ে মারা যায়।

জুনে গেণ্ডারিয়ায় দুই ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা কারণ থাকতে পারে। তবে এসব ঘটনা যানটির নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিতভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ছয় হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন।

এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সিপিডির এক গবেষণায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রায় ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়। দেশে তৈরি এসব রিকশার চেসিস ও ব্রেকিং ব্যবস্থার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, গ্যারেজ ও চার্জিং স্টেশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের আলোচনা চলছে।

আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রীও এসব বিষয়ে নীতি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অটোরিকশা তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড ও অনুমোদনব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কাঠামোয় এসব যান তৈরি হচ্ছে। কোনোটি লম্বা, কোনোটি চওড়া, আবার কোনোটি ভিন্ন নকশার।

অভিন্ন মডেল স্পেসিফিকেশন ও নিরাপত্তার মানদণ্ড ছাড়া এভাবে যান তৈরি করা উচিত নয়। তিনি বলেন, বিধিমালায় বুয়েটের তৈরি প্রোটোটাইপকে ভিত্তি ধরে অটোরিকশা তৈরির বিষয়টি এসেছে। এ ধরনের মানদণ্ড কার্যকর হলে যানবাহনের নিরাপত্তা ও কারিগরি তদারকি সহজ হতে পারে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সমাধানের পথ হতে পারে মানসম্মত চেসিস, পরীক্ষিত ব্রেক, নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতি, অনুমোদিত যাত্রীসংখ্যা, প্রশিক্ষিত চালক এবং বাধ্যতামূলক কারিগরি ফিটনেস পরীক্ষা।

যে গ্যারেজে যান তৈরি বা রূপান্তর করা হবে, সেখানে ব্যবহৃত মোটর, ব্যাটারির ক্ষমতা, চেসিসের ধরন, ব্রেকিং ব্যবস্থা ও নিরাপদ গতিসীমার তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এমন তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ থাকলে দুর্ঘটনার পর শুধু চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন হলে যানটির নির্মাণ ও রূপান্তর প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সাতক্ষীরায় প্রথম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা

লোকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তৈরি রিকশার ভয়ংকর মরণফাঁদ ও দুর্ঘটনা

Update Time : 10:35:48 pm, Tuesday, 13 October 2026

একটি ব্যাটারি রিকশার ধাক্কা। কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা। অথচ তাতেই বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবন। কেউ হারান হাত-পা, কেউ মাসের পর মাস পড়ে থাকেন হাসপাতালের বিছানায়। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হন স্বজনরা।

কারো জীবনে দুর্ঘটনার পর শুরু হয় দীর্ঘ পঙ্গুত্বের অধ্যায়। বৃদ্ধ রওশন আলীর জীবনেও নেমে এসেছে এমন দুর্বিষহ পরিণতি। একসময় ছিলেন ব্যবসায়ী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বজনদের ভরসা হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। চিকিৎসার পেছনে সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু ব্যয় করেও ফিরে পাননি স্বাভাবিক জীবন।

একসময়ের সচ্ছল এই ব্যবসায়ী বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে, এখন আমি পথের ভিখারি। শুধু রওশন আলী নন, ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন নানা বয়সি মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিশু, কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্করা। পাঁচ বছরের শিশু কামরাঙ্গীরচরের আবদুল্লাহও এমন এক দুর্ঘটনার শিকার। রাস্তা পার হওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় সে।

খাবার কেনার জন্য রাস্তার পাশের দোকানে যাওয়ার সময় ঘটে এ দুর্ঘটনা। শিশুটির বাবা জানান, ছেলেকে নিয়ে দোকানে যাওয়ার সময় একটি অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই আনন্দময় সময় পরিণত হয় আতঙ্কে। একটি দুর্ঘটনা শুধু শরীরে আঘাত করে না, থামিয়ে দেয় পরিবারের আয়-রোজগারও। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ভবিষ্যৎ। অথচ এসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে যানটির নির্মাণমান, ব্রেকিং ব্যবস্থা ও কারিগরি নিরাপত্তা কতটা যাচাই করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে আড়ালেই।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু চালকের বেপরোয়া গতি কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় গ্যারেজে রিকশা তৈরি ও রূপান্তরের পদ্ধতি নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচলিত প্যাডেলচালিত রিকশাকে পরিবর্তন করে ব্যাটারিচালিত রিকশায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও নতুন চেসিস তৈরি হচ্ছে, কোথাও পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে মোটর, ব্যাটারি, কন্ট্রোলার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ।

কিন্তু যে কাঠামো মানুষের পায়ের শক্তিতে তুলনামূলক ধীরগতিতে চলার জন্য তৈরি, সেটি মোটরের শক্তি ও অতিরিক্ত ওজন বহনের উপযোগী করে প্রকৌশলসম্মতভাবে পুনর্নকশা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় এসব যান তৈরির সঙ্গে যুক্ত মেকানিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্যারেজের কারিগরি অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই মোটর, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ বসানো হয়।

কোথায় ওয়েল্ডিং হবে, কীভাবে বডি বসবে, কত শক্তির মোটর লাগানো হবে, সেসব সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় ইচ্ছামতো। রায়েরবাজার এলাকার একজন মেকানিকের ভাষ্য, ইঞ্জিনিয়ার লাগে না, চোখের আন্দাজে ঝালাই করি। কাস্টমার সস্তায় চায়, আমরাও সেভাবেই বানাই। ওই মেকানিকের দাবি, মোটরের শক্তি বাড়লে পুরোনো ব্রেক দিয়ে যান নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। দ্রুতগতিতে হঠাৎ ব্রেক করলে চাকা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

জানা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তায় ব্রেক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোটরচালিত হওয়ায় এসব যান দ্রুতগতি তুলতে পারে। একই সঙ্গে চালক, যাত্রী, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের সম্মিলিত ওজন বহন করতে হয়। ফলে যানটির গতি ও মোট ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রেকিং ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে জরুরি মুহূর্তে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, এসব যান নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন পর্যায় থেকেই নজরদারি প্রয়োজন। চালক, মালিক কিংবা মেকানিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিগতভাবে এসব যান তৈরি করতে হবে। সর্বোচ্চ গতি সীমিত রাখার ব্যবস্থাও করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারে সীমিত রাখার ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত। কারণ সরু সড়কে দ্রুতগতির যান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রকৌশলসম্মত যান তৈরিতে শুধু মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করলেই চলে না। চেসিসের শক্তি, স্টিয়ারিং, টায়ার, সাসপেনশন, ব্রেক এবং ওজনের বণ্টন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়।

ব্যাটারি কোথায় বসানো হয়েছে, ভারকেন্দ্র কতটা উঁচুতে, বাঁক নেওয়ার সময় যানটি কতটা স্থিতিশীল থাকে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশলগত গবেষণায় নিরাপদ ই-রিকশার নকশা মূল্যায়নে ব্রেকিং দূরত্ব, ভারকেন্দ্র, কাঠামোগত শক্তি ও স্থিতিশীলতার মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। একটি গবেষণায় ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে ১০ মিটারের মধ্যে থামার সক্ষমতাকে নকশাগত বেঞ্চমার্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, রাজধানীর গ্যারেজে তৈরি বা রূপান্তর করা রিকশাগুলোর জরুরি ব্রেকিং পরীক্ষা হয় কি না। হলে সেই পরীক্ষার মানদণ্ড কী, ফলাফল কে সংরক্ষণ করে এবং পরীক্ষায় ব্যর্থ যানকে সড়কে নামা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা আছে কি না। তিন চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে ব্রেকের পাশাপাশি বাঁক নেওয়ার সময় স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। গতি বাড়ার সঙ্গে বাঁক নেওয়ার সময় পার্শ্বীয় বল বাড়ে।

কাঠামো দুর্বল হলে, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ উঁচুতে বসানো হলে কিংবা ওজনের বণ্টন অসম হলে দ্রুত বাঁক নেওয়ার সময় যানটি কাত হয়ে পড়া বা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই নিরাপদ যান নির্মাণে ভারকেন্দ্র, স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত শক্তি ও ব্রেকিং পারফরম্যান্স পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে তৈরি বা রূপান্তর করা যানগুলোর ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে কি না, তার সুস্পষ্ট তথ্য জরুরি।

দুর্ঘটনার পর তদন্তেও বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যানটির ব্রেক ঠিকমতো কাজ করেছিল কি না, চেসিসে ফাটল বা দুর্বল ওয়েল্ডিং ছিল কি না, টায়ারের মান কেমন, ব্যাটারি ও যাত্রীদের ওজনের ভারসাম্য ঠিক ছিল কি না, স্টিয়ারিংয়ে ত্রুটি ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্যাডেলচালিত রিকশার চালকদের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ গুরুতর থেকে অত্যন্ত গুরুতর দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানান। প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ৬ মে কামরাঙ্গীরচরে বাড়ির সামনে খেলতে থাকা পাঁচ বছরের এক শিশুকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ধাক্কা দিলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ১৮ জুলাই দক্ষিণখানে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার পর ১৭ বছর বয়সি এক কিশোর গুরুতর আহত হয়ে মারা যায়।

জুনে গেণ্ডারিয়ায় দুই ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা কারণ থাকতে পারে। তবে এসব ঘটনা যানটির নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিতভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ছয় হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন।

এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সিপিডির এক গবেষণায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রায় ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়। দেশে তৈরি এসব রিকশার চেসিস ও ব্রেকিং ব্যবস্থার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, গ্যারেজ ও চার্জিং স্টেশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের আলোচনা চলছে।

আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রীও এসব বিষয়ে নীতি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অটোরিকশা তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড ও অনুমোদনব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কাঠামোয় এসব যান তৈরি হচ্ছে। কোনোটি লম্বা, কোনোটি চওড়া, আবার কোনোটি ভিন্ন নকশার।

অভিন্ন মডেল স্পেসিফিকেশন ও নিরাপত্তার মানদণ্ড ছাড়া এভাবে যান তৈরি করা উচিত নয়। তিনি বলেন, বিধিমালায় বুয়েটের তৈরি প্রোটোটাইপকে ভিত্তি ধরে অটোরিকশা তৈরির বিষয়টি এসেছে। এ ধরনের মানদণ্ড কার্যকর হলে যানবাহনের নিরাপত্তা ও কারিগরি তদারকি সহজ হতে পারে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সমাধানের পথ হতে পারে মানসম্মত চেসিস, পরীক্ষিত ব্রেক, নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতি, অনুমোদিত যাত্রীসংখ্যা, প্রশিক্ষিত চালক এবং বাধ্যতামূলক কারিগরি ফিটনেস পরীক্ষা।

যে গ্যারেজে যান তৈরি বা রূপান্তর করা হবে, সেখানে ব্যবহৃত মোটর, ব্যাটারির ক্ষমতা, চেসিসের ধরন, ব্রেকিং ব্যবস্থা ও নিরাপদ গতিসীমার তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এমন তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ থাকলে দুর্ঘটনার পর শুধু চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন হলে যানটির নির্মাণ ও রূপান্তর প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব হবে।