বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া টিউশন ফির বড় একটি অংশ দিয়ে চলে শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য কার্যক্রম। কিন্তু সেই আয়ের উৎসেই এখন টান পড়েছে।
ভিসা পাওয়ার অনিশ্চয়তা, আবেদনের বিপুল খরচ এবং অভিবাসন নীতিতে একের পর এক পরিবর্তনের কারণে দেশটিতে নতুন শিক্ষার্থীর আগমন প্রত্যাশার তুলনায় কম হচ্ছে। এতে আর্থিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। রোববার (১১ অক্টোবর) অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির এই পরিস্থিতি উঠে এসেছে।
সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যত আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখনো পূরণ হয়নি। মাত্র পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত আসনের ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পেরেছে। এই সংকট সবচেয়ে প্রকট বড় শহরের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নিউ সাউথ ওয়েলসের চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।
চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ আসনের মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে। আগের বছরের তুলনায় বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। করোনা মহামারির আগে যে সংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেখানে পড়তেন, বর্তমানে রয়েছেন তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ। শিক্ষার্থী কমার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়েও বড় ধাক্কা লেগেছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা মাইক ফার্গুসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মহামারির আগের তুলনায় বছরে প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার আয় হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাই ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসার পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ভিসা আবেদনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করার পরও অনুমোদন মিলবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি দুই হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার। আবেদন বাতিল হলে সেই অর্থও ফেরত পান না শিক্ষার্থীরা। ফলে পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি ভিসার আর্থিক ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হচ্ছে তাঁদের। চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তা মাইক ফার্গুসনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের মধ্যে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ৫৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মতো দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এ পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সিডনির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক চাপ অনুভব করছে। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ উইলিয়ামস জানিয়েছেন, বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠছে।
আয় কমতে থাকলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য চালু থাকা বিভিন্ন সেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি টিউশন ফি দিয়ে থাকেন। এই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয়, গবেষণা এবং শিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার প্রভাব পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জর্জ উইলিয়ামস মনে করেন, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিদেশি শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। পড়াশোনা শেষে অস্ট্রেলিয়ায় কাজের সুযোগ কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ছেন। এদিকে ভিক্টোরিয়ার ফেডারেশন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ডানকান বেন্টলি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংকট থেকে বের করে আনতে ভিন্ন ধরনের ভিসা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, যেসব এলাকায় দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষকতা ও প্রয়োজনীয় পেশাভিত্তিক বিষয়ে পড়তে আগ্রহীদের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউডও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, আঞ্চলিক এলাকায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে ভবিষ্যতে নার্সিং, প্রবীণদের পরিচর্যা, শিশু পরিচর্যা ও প্রকৌশলের মতো খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনাগত সংখ্যা নির্ধারণ করেছে দুই লাখ ৯৫ হাজার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃত ভর্তি প্রায় আড়াই লাখে সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিসা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন। গত ২ অক্টোবর থেকে অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকলেও পরিবারের সদস্যদের ভিসায় অন্তর্ভুক্ত করার নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে বছরে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা দুই লাখ ৪০ হাজারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা দিয়েছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের এসব প্রস্তাবও আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু আয় কমা বা কর্মী ছাঁটাইয়ের মধ্যেই সংকট সীমাবদ্ধ থাকবে না।
গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং বড় শহরের বাইরের অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।






















