২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে নরওয়ে ও নোবেল কমিটির সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুরস্কারটি না পাওয়ায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
একই সঙ্গে পুরস্কার প্রদানের সঙ্গে যুক্ত দেশ নরওয়েকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আমরা নরওয়েকে ভুলব না। ’ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) এক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার অর্জন তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য করে তুলেছে। কিন্তু কমিটি রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বছর শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনে অবদানের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী এবং জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা আসে। সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার প্রতিনিধিত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।
’ কমিটির সিদ্ধান্তকে লজ্জাজনক ও বিব্রতকর আখ্যা দিয়ে তিনি আরও দাবি করেন, উগ্র মতাদর্শীরা পুরস্কারটির মর্যাদা নষ্ট করেছেন। তার ভাষায়, তারা গণতন্ত্র ও সভ্যতার বিরোধী। পুরস্কারপ্রাপ্ত পিল্লাইয়ের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজ্ঞের নাম তিনি আগে কখনো শোনেননি। নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পিল্লাইকে এ বছরের পুরস্কার দিয়েছে।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সময় জন্ম নেওয়া পিল্লাই মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরে তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও (আইসিসি) বিচারক ছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন।
রুয়ান্ডার সংঘাতের সময় গণহত্যা ও যৌন সহিংসতাসংক্রান্ত মামলাতেও তার বিচারিক ভূমিকা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরাইল নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে কমিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েনের মধ্যেই এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একই দিনে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে আদালতকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আরও বাড়ে। কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি ট্রাম্পের ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধে তার হস্তক্ষেপের কারণে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।
শুক্রবারের সমাবেশেও তিনি আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি করেন। পাশাপাশি ইরান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আরও অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলেন। তবে তার এসব দাবির সত্যতা ও ব্যাপ্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের উল্লেখ করা কয়েকটি বিরোধের ক্ষেত্রে এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হয়নি। অন্য কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমঝোতা হলেও মূল সংঘাতের স্থায়ী সমাধান আসেনি।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নিয়েছিল। পরে ওয়াশিংটন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিলেও সামরিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে ট্রাম্পের নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু রাশিয়ার সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হয়নি।
নোবেল কমিটির সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে নিজের কূটনৈতিক অর্জনের তুলনা করে আসছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ২০০৯ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন ওবামা। মাচাদুর নোবেল পদক ঘিরেও বিতর্ক ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদুর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কও তার হতাশার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান মাচাদু। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি নিজের নোবেল পদক ট্রাম্পকে দেন। তবে নোবেল কমিটি পরে জানায়, পদক অন্য কাউকে দেওয়া হলেও নোবেল পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা যায় না। পুরস্কার প্রত্যাহার, ভাগ করে দেওয়া কিংবা অন্য কারও নামে স্থানান্তরেরও সুযোগ নেই।
নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভের কারণে নরওয়েকে কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়তে হচ্ছে। যদিও দেশটির সরকার পুরস্কারপ্রাপকদের নির্বাচনে সরাসরি কোনো কর্তৃত্ব রাখে না। নরওয়ের পার্লামেন্ট নিযুক্ত পাঁচ সদস্যের একটি স্বাধীন কমিটি নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচন করে। আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী, শান্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্ব এই কমিটির।
তাই ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর প্রশ্ন উঠেছে, স্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্তে অসন্তোষের প্রভাব ন্যাটোর দীর্ঘদিনের মিত্র নরওয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও পড়বে কি না। আন্তর্জাতিক আদালতগুলোকে ঘিরে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান বিরোধের মধ্যেই এ বিতর্ক সামনে এসেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধসংক্রান্ত বিচারিক কার্যক্রমের কারণে আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে ও আদালতের অন্য কর্মকর্তাদের প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে রাশিয়া।
এ পরিস্থিতিতে সাবেক আইসিসি বিচারক পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের পুরস্কার না পাওয়ার হতাশার বাইরেও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হবে।






















