বৃক্ষরোপণকে শুধু সরকারি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, প্রাকৃতিকভাবে কিছু চারা মারা যাবে।
তাই আগামী চার বছরের পরিকল্পনায় এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নার্সারির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জেলার মাটি, আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে উপযোগী গাছ নির্বাচন করে রোপণ করতে হবে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে গঠিত বৃক্ষরোপণ সেলের পঞ্চম সভায় এসব কথা বলা হয়।
বুধবার বিকেলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বৃক্ষরোপণ সেলের সভাপতি নজরুল ইসলাম খান। সভায় পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বৃক্ষরোপণ কেবল একটি কর্মসূচি নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। এ আন্দোলন সফল করতে জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননার সঙ্গে গাছের চারা উপহার দেন এবং সবাইকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেন। কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণে কোনো অনিয়ম ও অনাচার সহ্য করা হবে না।
পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বন অধিদপ্তরকে নার্সারির সক্ষমতা বৃদ্ধির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে কোন জেলায় কোন প্রজাতির গাছ বেশি উপযোগী এবং কোন গাছের অর্থনৈতিক মূল্য বেশি—এসব বিবেচনায় নিয়ে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা করার কথা বলেন তিনি। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া ও ভূমিরূপ বিবেচনায় বৃক্ষরোপণ করলে গাছের বেঁচে থাকার হার বাড়ানো সম্ভব।
এ বিবেচনায় আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি কেওড়া গাছের চারা রোপণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, এর পরিচর্যা, সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় পুনঃরোপণ এবং বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করতে হবে। আগামী চার বছরের কর্মপরিকল্পনায় রোপণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখতে হবে।
একই সঙ্গে রোপণস্থলের তথ্য সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি। সভায় উপস্থাপিত অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনার বিপরীতে এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৬৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
নির্ধারিত ছকে তথ্য দেওয়া ১১টি দপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪ লাখ এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫২ লাখ ৯৩ হাজার চারা রোপণের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগেও বৃক্ষরোপণ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়টি দপ্তর ইতোমধ্যে তাদের নির্ধারিত বৃক্ষরোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উপকূলীয় অঞ্চলে বন অধিদপ্তরের আরও ২ কোটি ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে চলতি বছরের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর নির্ধারিত ছকে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংগঠনের বৃক্ষরোপণের তথ্যও একই কাঠামোয় সংগ্রহ করে সমন্বিত হিসাব তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে সম্পৃক্ত করতে ‘ওয়ান ট্রি ওয়ান চাইল্ড’ উদ্যোগের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় যথাক্রমে ৬ কোটি ১৫ লাখ, ৫ কোটি ৪ লাখ এবং ২ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
বৃক্ষরোপণের তথ্য সংরক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ও ড্যাশবোর্ড তৈরির অগ্রগতিও সভায় আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে কর্মশালা, তথ্য সংগ্রহের অভিন্ন কাঠামো এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞের সহায়তায় সম্ভাব্যতা ও ব্যয় যাচাইয়ের বিষয়েও আলোচনা করা হয়। সভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম অনলাইনে যুক্ত হন।
সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবি মতামত দেন। তাঁরা বৃক্ষরোপণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


























