মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আজ মধ্যরাত থেকে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে শুরু হচ্ছে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এ সময় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
সরেজমিনে বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাকিমউদ্দিন, হাসান নগর, মির্জাকালু ও সাচড়াসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, জেলেরা এরই মধ্যে নদী থেকে জাল গুটিয়ে তীরে ফিরতে শুরু করেছেন। ঘাটে ঘাটে সারি বেঁধে রাখা হচ্ছে শত শত ট্রলার ও নৌকা। শেষ মুহূর্তে যারা নদীতে আছেন, তারাও মধ্যরাতের আগেই ঘাটে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে নিষেধাজ্ঞা মেনে নদী ছাড়লেও জেলেদের চোখে-মুখে এখন জীবিকা নিয়ে চরম শঙ্কা।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩৮ জন। এবারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ১৭ হাজার ২০০ জেলেদের জন্য মাথাপিছু ২৫ কেজি হারে মোট ৪৩০ টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই বরাদ্দ আর বাস্তবতার মেলবন্ধন মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা। মির্জাকালু ঘাটে ট্রলার বাঁধতে বাঁধতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রবীণ জেলে রহিম মাঝি বলেন, সরকারের আইন তো মানতেই হইব, তাই ডাঙ্গায় উইঠা আইছি।
কিন্তু এই ২২ দিন পোলাপান লইয়া খামু কী? সরকারি যে ২৫ কেজি চাল দেয়, তা দিয়া কি পুরা মাস চলে? এর মধ্যে আবার এনজিওর কিস্তির চাপ। ধারদেনা কইরা কোনোমতে সংসার চালাইতে হইবো। হাকিমউদ্দিন ঘাটের জেলে সাত্তার হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, নদীতে না গেলে আমাগো ইনকাম জিরো। অবরোধের সময় সরকার যে চাল দেয়, তা হাতে পাইতে পাইতে অবরোধ অর্ধেক শ্যাষ হইয়া যায়।
অনেক সময় আসল জেলেরা ঠিকমতো পায়ও না। আমাগো দাবি, অবরোধ শুরুর লগেলগেই চালটা আমাগো হাতে দেওয়া হোক, আর এই সময় অন্তত এনজিওর কিস্তি নেওয়া বন্ধ থাকুক। সাচড়া ঘাটে বসে ছেঁড়া জাল বুনছিলেন তরুণ জেলে জামাল। তিনি বলেন, পেট তো আর অবরোধ বোঝে না ভাই! পরিবারের মুখের দিকে তাকাইয়া এই ২২ দিন আমাগো কাছে ২২ বছরের সমান মনে হয়। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযান কিছুটা ‘ঢিলেঢালা’ হওয়ায় অনেক সময় অসাধু জেলেরা এর সুযোগ নিয়ে নির্বিঘ্নে নদীতে মাছ শিকার করেছে।
তাই মা ইলিশ রক্ষায় এবার প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা। এসব অভিযোগ ও জেলেদের শঙ্কার বিষয়ে বোরহানউদ্দিন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোজ কুমার শাহা বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছি। আজ মধ্যরাত থেকেই নদীতে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি শুরু হবে। আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানাসহ জাল ও ট্রলার বাজেয়াপ্ত করা হবে।
তবে জেলেদের কষ্ট লাঘবে ১৭ হাজার ২০০ নিবন্ধিত জেলের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৩০ টন চাল দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছরই প্রজনন মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই সময়ে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় মা ইলিশ রক্ষা পেলে ভবিষ্যতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়ায় ইলিশের প্রাচুর্য আরও বাড়বে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।






















