সাতক্ষীরায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের নির্মম ছুরিকাঘাতে নিহত কলেজছাত্র মো. জাকারিয়া খান (১৯) হত্যা মামলার প্রধান আসামি এবং গ্যাং লিডার নাহিদ হাসানকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
একই যৌথ অভিযানে এই হত্যা কাণ্ডের সহায়তাকারী আসামি অমিত হাসান ওরফে শিপনকেও (৩০) আটক করা হয়েছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভোররাত ৪টার দিকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত মূল ঘাতক নাহিদ হাসান সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা পশ্চিমপাড়া মানিকতলা এলাকার মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে।
অপর গ্রেপ্তারকৃত অমিত হাসান ওরফে শিপন একই এলাকার মো. হুমায়ুন কবিরের ছেলে। পুলিশ সূত্র জানায়, জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই অভিযুক্ত নাহিদ ও তার সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের একটি চৌকস টিম গোপন সূত্রে জানতে পারে—মামলার প্রধান আসামি নাহিদ অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় গা ঢাকা দিয়েছেন।
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর টিম সোমবার গভীর রাতে সীমান্ত এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। পরবর্তীতে মঙ্গলবার ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ইউনিয়নের শুইলপুর গ্রামে শিপনের পৈতৃক বাড়ি ঘেরাও করে দুজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ভারতে পার হয়ে যাওয়াই ছিল তাদের মূল পরিকল্পনা।
মামলার এজাহার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার রাতে সাতক্ষীরা শহরের পশু হাসপাতালের পাশে ‘কদম গাছ তলা’ এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন নিহত জাকারিয়া। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চায়ের দোকানদারের সঙ্গে একদল বখাটে তরুণের কথাকাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বখাটেরা দোকানদারকে মারধর করতে উদ্যত হয়। মানবিক খাতিরে এবং দোকানদারকে রক্ষা করতে জাকারিয়া এগিয়ে গিয়ে তাদের থামানোর চেষ্টা করেন। এ সময় ক্ষিপ্ত হয়ে কিশোর গ্যাং নেতা নাহিদ তার সঙ্গে থাকা তর সহপাঠীরা ধারালো ছুরি দিয়ে জাকারিয়ার বুক ও পেটে একাধিক নৃশংস আঘাত করে। জাকারিয়া রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত চম্পট দেয়।
স্থানীয় দোকানদার ও পথচারীরা তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতেই (৩ অক্টোবর) রাত ১২টা ২০ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ। নিহত জাকারিয়ার আকস্মিক ও নির্মম মৃত্যুতে পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মো. শাহরিয়া খান বাদী হয়ে শনিবার রাতে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নম্বর: ১২) দায়ের করেন।
মামলায় কিশোর গ্যাং নেতা নাহিদ হাসানকে ১ নম্বর ও প্রধান আসামি করে মোট ১২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনা ও আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মেধাবী তরুণ জাকারিয়া হত্যা একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অপরাধীরা অন্যায় করে পার পাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিল।
তবে আমাদের জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সদর থানা পুলিশের তাৎক্ষণিক ও যৌথ অভিযানের কারণে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ভোররাতে সীমান্ত এলাকা থেকে মূল আসামিসহ দুজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রধান আসামি নাহিদকে সাথে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।






















