হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইয়েমেন সরকার। ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে এ অভিযানের লক্ষ্য দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজধানী মুক্ত করা এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটানো বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি।
গতকাল সোমবার ইয়েমেনের সেনাবাহিনী জানায়, লোহিত সাগরের উপকূলে তাইজ গভর্নরেটের ধুবাব জেলা এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের কয়েকটি অবস্থান তারা পুনর্দখল করেছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবার খবরে এ তথ্য জানানো হয়। তবে হুতিরা ধুবাব পুনর্দখলের দাবি অস্বীকার করেছে। ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি বলেন, বিমান সহায়তা নিয়ে স্থলবাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর লোহিত সাগর উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে হুতি যোদ্ধারা পিছু হটেছে।
তার দাবি, উপকূলীয় শহর ধুবাব এখন সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি এ অভিযানকে ‘রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের নতুন পর্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে তিনি বলেন, অভিযানের উদ্দেশ্য ইয়েমেনের প্রতিটি ইঞ্চি ভূখ-ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তার ভাষ্য, বাব আল-মানদেব প্রণালির ভূমি, দ্বীপ ও কৌশলগত অবস্থান পুনরুদ্ধার করা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌচলাচল সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।
ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে অনেকটা স্থবির থাকা গৃহযুদ্ধে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ২০২২ সালের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি গত জুলাইয়ে ভেঙে পড়ার পর ইরান-সমর্থিত হুতি ও সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়। এর পর থেকে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এলাকা এবং বাব আল-মানদেবের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঞ্চল দখল করে নেয়।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা বাব আল-মানদেব আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে এ অঞ্চলে লড়াই বাড়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নৌচলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘাতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র তাইজ। কৌশলগত এ শহর হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে এডেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে বিবেচিত।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগী গবেষক বারা শিবানের মতে, গত মাসে লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোকা দখলের পর হুতিরা আশপাশের উচ্চভূমিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তাইজের নিয়ন্ত্রণ তাদের পরবর্তী অগ্রযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র‍্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি বলেন, নতুন করে সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় ইয়েমেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার মতে, হুতিরাও এখন আলোচনার দিকে যাওয়ার অবস্থায় নেই; বরং তারা আরও ভূখ- দখল করে নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইতে পারে। তবে পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির সব খবর এখনো নিশ্চিত নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। এদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ‘সবাইকে গ্রাস’ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতেও নতুন ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালিটি অতিক্রমকারী একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে থামার নির্দেশ দেয়। ওমানের খাসাবের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে ঘটনাটি ঘটে। আইআরজিসির নির্দেশ মেনে ট্যাংকারটির ক্যাপ্টেন গতিপথ পরিবর্তন করেন।






















