একসময় ভাদ্র মাস এলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে তৈরি হতো তালের বড়া। পাকা তালের শাঁস, চালের গুঁড়া বা ময়দা এবং গুড় বা চিনি দিয়ে তৈরি এ মিষ্টান্ন ছিল গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত অংশ।
সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়ায় বাড়িতে তালের বড়া তৈরির প্রচলন কমেছে। এখন মৌসুমে নবীনগর বাজারের কয়েকটি দোকানেই মূলত এর দেখা মেলে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে বাড়ির তালগাছের তাল পাকলে পরিবারের সদস্যরা মিলে তা সংগ্রহ করে বড়া তৈরি করতেন। অতিথি আপ্যায়নেও এটি পরিবেশন করা হতো। অনেকের কাছে তালের বড়া এখনো শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি খাবার।
তালের বড়া তৈরিতে সাধারণত পাকা তালের শাঁস বা রসের সঙ্গে চালের গুঁড়া কিংবা ময়দা, গুড় বা চিনি মেশানো হয়। এরপর মিশ্রণটি ছোট ছোট আকারে তৈরি করে গরম তেলে ভেজে নেওয়া হয়। পরিবার ও অঞ্চলভেদে তৈরির পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। নবীনগরের প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, আগে ভাদ্র মাসে তাল পাকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে বড়া তৈরির আয়োজন শুরু হতো।
পরিবারের সদস্যরা মিলে তাল ছাড়িয়ে শাঁস বের করতেন। শিশুদের মধ্যেও এ খাবার তৈরিকে ঘিরে থাকত বাড়তি আগ্রহ। এখন ব্যস্ততা ও সময়ের অভাবে সেই চর্চা অনেকটাই কমে গেছে। বাড়িতে তৈরি কমলেও নবীনগর বাজারে মৌসুমে তালের বড়া বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি কেজি তালের বড়া ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আদালত পুকুরের পূর্ব পাশে রঞ্জনের (জিলাপি) দোকান, আদালত সড়কের ভাগ্যলক্ষ্মী, সদর সড়কের গিরিধারী, জমিদার বাড়ি সড়কের ইসলাম সুইটস ও বিসমিল্লাহ সুইটস, কানাইলালের শুভ মিষ্টি বিতান এবং নবীনগর লঞ্চঘাটের ভাই ভাই মিষ্টির দোকানসহ কয়েকটি দোকানে মৌসুমে তালের বড়া পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানান। দোকানিরা জানান, সারা বছর তালের বড়া তৈরি করা যায় না।
পাকা তাল পাওয়ার মৌসুমেই এর উৎপাদন ও বিক্রি বেশি হয়। পুরোনো ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেকেই কৌতূহল থেকে তালের বড়া কিনছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, তালের বড়া শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, এটি গ্রামীণ খাদ্যঐতিহ্যেরও অংশ। কিন্তু বাড়িতে তৈরির চর্চা কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ খাবার তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে না।
তাদের মতে, পরিবারে তালের বড়া তৈরির চর্চা ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনে দেশীয় মিষ্টান্নের প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। নবীনগরের মানুষের কাছে তালের বড়া এখনো পুরোনো দিনের স্বাদের স্মারক। বাজারে এর উপস্থিতি থাকলেও ঘরে ঘরে তৈরির ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাংলার এই পরিচিত মিষ্টান্নটি ধীরে ধীরে স্মৃতির খাবারে পরিণত হওয়ার পথে।






















