টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে তামান্না ইসলাম তরী (১৮) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত স্বামী মোহাম্মদ রোমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে উপজেলার ১ নম্বর দেউলাবাড়ি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর খিলগাতী মধ্যপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত তামান্না ইসলাম তরী উত্তর খিলগাতী গ্রামের প্রবাসী তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে। ঘটনার পর তার স্বামী রোমান পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে ঘাটাইল ও মধুপুর থানার পুলিশ সদস্যরা দুই থানার সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত মাস আগে পারিবারিকভাবে তামান্না ইসলাম তরীর বিয়ে হয় পাশের মধুপুর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চাপারকোনা গ্রামের ইন্টারনেট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে।
রোমান ওই গ্রামের তুলা মিয়ার ছেলে। স্থানীয়রা জানান, বিয়ের পর থেকেই রোমান ও তরীর মধ্যে পারিবারিক কলহ চলছিল। রোমান পেশায় একজন ইন্টারনেট ব্যবসায়ী। নিহত তরীর মা মোসাম্মৎ সাহানাজ বেগম অভিযোগ করে বলেন, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। তরী তাদের বড় সন্তান। মেয়ের বাবা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে অনেক টাকা খরচ করে পারিবারিকভাবে রোমানের সঙ্গে তরীর বিয়ে দেন।
বিয়ের সময় সাত ভরি স্বর্ণসহ মোটা অঙ্কের নগদ টাকা যৌতুক দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় দেওয়া স্বর্ণ ও নগদ টাকা রোমান মোবাইলে জুয়া খেলে নষ্ট করে ফেলেন। এরপর প্রায়ই তরীকে তার বাবার বাড়ি থেকে মোটা অঙ্কের টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে না পারায় তরীকে বিভিন্ন সময় নির্যাতন, মারধর ও গালিগালাজ করা হতো।
সাহানাজ বেগম বলেন, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত শুক্রবার রাগ করে শাশুড়িকে জানিয়ে তরী স্বামীর বাড়ি থেকে তার বাবার বাড়িতে চলে আসে। এরপর চার-পাঁচ দিন মেয়ের কোনো খোঁজ না নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে রোমান তাদের বাড়িতে আসে। সেখানে তরীকে তার সঙ্গে স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। তরী যেতে অস্বীকৃতি জানালে তার সামনেই রোমান কয়েক দফা তরীকে মারধর করেন।
পরে রাতে দুজনেই খাবার না খেয়ে তার বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়েন। সাহানাজ বেগম বলেন, তিনি দোতলায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতে মেয়ের চিৎকার শুনে নিচে নেমে এসে ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে ঘরের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পান। পরে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় দরজা ভেঙে ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় তরীকে পড়ে থাকতে দেখেন।
ভোররাতে তরীকে মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মেয়েকে হত্যার বিচার দাবি করে সাহানাজ বেগম বলেন, তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার ও অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি চান। এ কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন ও জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। দেউলাবাড়ি ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু হানিফ বলেন, মেয়েটিকে তার স্বামী নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
তরীর পরিবার একটি সুখী পরিবার। সাত-আট মাস আগে পার্শ্ববর্তী আলোকদিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চাপারকোনা গ্রামে তাদের মেয়ের বিয়ে হয়। তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি তরীর বাড়িতে গিয়ে ঘাটাইল থানার পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশ আসার আগেই তরীকে মধুপুর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তরীর শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন।
এ ধরনের নির্মম ঘটনা এলাকায় আগে কখনো ঘটেনি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করেন তিনি। ঘাটাইল থানার ওসি মোকসেদুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত রোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়া গেলে মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।



















