ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ ধাপ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সম্পন্ন হচ্ছে। দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে ইরাকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এই প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে।
তবে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে দেশটির তেল বিক্রির অর্থের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের তেল বিক্রির ডলার মূলত নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হয়। এর ফলে বাগদাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে। এর প্রভাব ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও পড়ছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর দেশটির তেল বিক্রির অর্থ সংগ্রহ এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়নকাজে ব্যবহারের জন্য ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক (ডিএফআই) গঠন করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি (সিপিএ)। তহবিলটি নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রাখা হয়। ডিএফআই গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা, দাবি বা আইনি জটিলতা থেকে দেশটির তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখা।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ ব্যবস্থা চালুর জন্য একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। এরপর থেকে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও ওই ব্যবস্থা নবায়ন করেছেন। সময়ের সঙ্গে ডিএফআই ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (সিবিআই) একটি হিসাবে রূপ নেয়, যা নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভেই পরিচালিত হচ্ছে। ইরাকের রাজস্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস তেল।
দেশটির রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। ফলে তেল বিক্রির অর্থের প্রবাহ ও সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাগদাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করে। ২০২০ সালে ইরাক সরকার যখন মার্কিন সেনাদের দেশ থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, তখন ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকের তহবিলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বাগদাদ সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। অবশ্য দখলদারিত্বের শুরুর সময়ের তুলনায় নিজেদের আর্থিক বিষয়ে ইরাকের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়েছে। তারপরও নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে তেল আয়ের এই সম্পর্ক দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করে। ইরাক যখন নিজের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে, তখন এই আর্থিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরাকি সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, এই ব্যবস্থা দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের মতে, নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে তেল আয়ের ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরাকের অর্থ পরিচালনা নিয়ে আস্থা বাড়ায়। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেও এটি সহায়তা করে।
ঋণদাতাদের দাবি, মামলা-মোকদ্দমা ও অন্যান্য আর্থিক ধাক্কাসহ বাইরের বিভিন্ন দাবি থেকে তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে। এটি ইরাকের মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর আস্থা ধরে রাখতেও সহায়তা করে। পাশাপাশি ইরাকের নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা ও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও এ ব্যবস্থা যুক্ত।
এই ব্যবস্থার আরেকটি দিক হলো, ডলারে প্রবেশাধিকার কমানোর বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবিতে থাকা ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বাগদাদ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের হয়ে অর্থপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে।
ইরাকে মার্কিন ডলারের সরবরাহের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে একটি সমান্তরাল অনানুষ্ঠানিক ডলার বাজার গড়ে উঠেছে। ফলে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার এবং কালোবাজারে ডলারের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এই মূল্য ব্যবধান আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের ঝুঁকির জন্য অতিরিক্ত মূল্য বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ হিসেবে কাজ করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করছেন। এ পরিস্থিতিতে ইরাক প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েনের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে। কারণ, ইরান ইরাককে তার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধ ইরাকের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে।
ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ এখনও নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতে রয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে চলে গেলেও দেশটির তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনায় নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা শেষ হয়নি। ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐতিহাসিকভাবে ডলার সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ‘ডলার নিলাম’ বা আনুষ্ঠানিকভাবে ফরেন কারেন্সি উইন্ডো ব্যবহার করে এসেছে।
এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন ইরাকি দিনার ব্যবহার করে মার্কিন ডলার কেনার জন্য দরপত্র দিতে পারত। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মতো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগে ব্যাপক দমন অভিযান ও যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যেই এ ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়।
ফলে মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে প্রত্যাহার দেশটির মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটালেও তেল বিক্রির অর্থ ও ডলার ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আর্থিক প্রভাব পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। বরং ইরাকের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তেল আয়ের অর্থ কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে তা ডলারে রূপান্তরিত হবে—এই প্রশ্নে নিউইয়র্ক ফেড এখনও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।



















