বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর এনডিসি ৩.০-এর অগ্রাধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশি-বিদেশি জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
তাঁরা বলেছেন, জলবায়ু অর্থায়নের নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার এবং অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ‘দ্য রোড টু আন্টালিয়া: ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যান্ড এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক প্রি-COP31 আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে এসব বিষয় উঠে আসে।
UNFCCC-এর অধীনে অনুষ্ঠিতব্য COP31-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (BCCT), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং UNESCO Chair on Education for Sustainable Development, Green Skills and Climate Actions যৌথভাবে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি।
বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম। ওয়েবিনারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে অভিযোজন ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে জাতীয় জলবায়ু তহবিল গঠন করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলা এবং NDC 3.0-এর অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে অর্থায়নের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে।
তাই জাতীয় অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো জরুরি। BCCT Strategic Plan 2026–2030-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প প্রস্তুত, প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম পরিবেশ দূষণ হ্রাস ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পাশাপাশি এসব বাস আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে কর কমানো হয়েছে। কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটির ব্যবহার কমাতে খাল খনন থেকে পাওয়া মাটি ইটভাটা ও ব্লক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইটভাটাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং ইট পোড়ানোর কাজে কাঠের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং প্লাস্টিক দূষণ ও একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিনের ব্যবহার মোকাবিলায় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে সরকার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আধুনিকায়নের পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ওয়েবিনারে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, New Collective Quantified Goal (NCQG)-এর আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্বে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও বিকল্প উৎস থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন বছরে অন্তত ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার আহ্বান রয়েছে।
আলোচনায় বলা হয়, ২০৩৫ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শুধু অভিযোজন অর্থায়নের প্রয়োজনই বছরে প্রায় ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ অঞ্চলভেদে অত্যন্ত অসম। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনো প্রয়োজনীয় অর্থায়নে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আকৃষ্ট করতে শুধু অর্থের প্রয়োজন তুলে ধরা যথেষ্ট নয়।
প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক গ্রহণযোগ্যতা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রত্যাশিত ফলাফলও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। প্যানেল আলোচনায় Green Climate Fund (GCF), বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, Paris Agreement-এর Article 6-এর আওতাধীন সহযোগিতামূলক উদ্যোগ এবং বেসরকারি পুঁজির মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
পাশাপাশি অভিযোজন ও প্রশমন অগ্রাধিকারকে অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরি এবং সরকারি-বেসরকারি ও মিশ্র অর্থায়নের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তুরস্কের আন্টালিয়ায় আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য COP31-এর প্রাক্কালে আয়োজিত এ সংলাপে জলবায়ু অর্থায়ন, NDC 3.0 বাস্তবায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে মতবিনিময় হয়।
আয়োজকরা জানান, ওয়েবিনারের আলোচনা ও সুপারিশ জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, NDC 3.0 বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়ক হবে। আলোচনার ভিত্তিতে একটি Outcome Statement প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। উল্লেখ্য, ওয়েবিনারটি বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়।
এতে উদ্বোধনী পর্ব, বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনা ও উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল।



















