খরতাপ পেরিয়ে হিমেল হাওয়ার আগমনী বার্তার সঙ্গে কুমিল্লার লাকসামে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে উপজেলার ৩৮টি পূজামণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
প্রতিমায় তুলির শেষ আঁচড় দিতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা। আগামী ১৬ অক্টোবর ঘটপূজার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহন হবে। এ বছর দেবীর আগমন দোলনায় এবং গমন নৌকায় হবে বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন কমিটি। লাকসাম পৌর শহরের সদর কালীবাড়ি, উত্তর বাজার বণিক্য বাড়ি, জগন্নাথ দেবালয়, দক্ষিণ লাকসামের প্রয়াত নিরঞ্জন বণিকের বাড়ি ও পশ্চিমগাঁও সাহাপাড়াসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ।
পারিবারিক ও সর্বজনীন পূজামণ্ডপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া আয়োজনের জন্যও তৈরি হচ্ছে নানা নকশার প্রতিমা। আধুনিক ও নান্দনিক প্রতিমা তৈরিতে অনেক ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা জানান, শ্রাবণ মাস থেকে চুক্তিভিত্তিক প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়।
একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় সাড়ে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। বাঁশ, কাঠ, খড়, পাট, রশি ও মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। রোদে মাটি শুকানোর পর এখন চলছে রং ও অলঙ্করণের কাজ। কারিগররা জানান, ছোট আকৃতির প্রতিমা তৈরিতে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বড় প্রতিমার ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বংশপরম্পরায় এ পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অনেক মৃৎশিল্পী। এদিকে দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লাকসাম উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রণজিৎ সাহা টাবলু বলেন, অশুভ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠাই দুর্গোৎসবের মূল দর্শন।
সর্বজনীন এ মিলনমেলায় সব সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে আমরা প্রতিবছর উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করি। এ অঞ্চলের মানুষ অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার বন্ধনে আবদ্ধ। কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বতম সাহা বিশু বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অপার মিলনমেলা। অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের চর্চাই এ উৎসবের মূল বার্তা।
ধর্ম যার যার, কিন্তু আনন্দ ও সম্প্রীতি সবার। আমাদের অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বন্ধন ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে—এটাই প্রত্যাশা। পশ্চিমগাঁও ঠাকুরপাড়া দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও হিন্দু সমাজনেতা প্রকৌশলী শিশির কুমার আচার্য বলেন, প্রতিমা তৈরির ব্যয় কিছুটা বাড়লেও আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে।
আবহমানকাল ধরে চলে আসা সম্প্রীতি ও ঐক্য ধরে রেখে দেশের কল্যাণে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।



















