মক্কায় ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চুক্তির মূল দর্শন অনেকটা ন্যাটোর পঞ্চম ধারার মতো, অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করা হবে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখানোর খবর এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর নিছক কূটনৈতিক কৌতূহল নয়; এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমেই মনে রাখা দরকার, একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া আর কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশ বহু দেশের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, শান্তিরক্ষা ও সামরিক শিক্ষা নিয়ে সহযোগিতা করে। সৌদি আরবের সঙ্গেও ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে প্রথম যৌথ কমিটির বৈঠক হয়েছে, যেখানে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা শিল্প ও মহড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার কথা এসেছে। কিন্তু মক্কা চুক্তির মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের অর্থ হলো, ভবিষ্যতে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হয়ে যেতে পারে।
এখানেই সহযোগিতা ও জোটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। সামরিক জোটের ইতিহাস এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তার মধ্যে ন্যাটো একটি সফল উদাহরণ। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারটি শুধু কাগজে থাকেনি; দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক প্রস্তুতি, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সমন্বিত কমান্ড এবং সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে এটি একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
ন্যাটোর পঞ্চম ধারা বাস্তবে মাত্র একবার (২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করা হলেও এর বড় শক্তি ছিল হামলা হওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা। অর্থাৎ কার্যকর জোটের শক্তি শুধু ‘কে কাকে যুদ্ধে সাহায্য করবে’ তাতে নয়; বরং তার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামরিক সক্ষমতা, অভিন্ন স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানগত প্রস্তুতিতে।
কিন্তু সব জোট ন্যাটো হয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় চুক্তি সংস্থা সিয়াটোর ইতিহাস বরং সতর্কবার্তা। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোটের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো। কিন্তু সদস্যদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ফারাক এতটাই ছিল যে জোটটি কার্যকর সামরিক কাঠামো হয়ে উঠতে পারেনি। পাকিস্তানও শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে সিয়াটো থেকে বেরিয়ে যায়, কারণ ভারতের সঙ্গে তার সংঘাতে সংগঠনটি প্রত্যাশিত সহায়তা দিতে পারেনি।
১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জোটটির প্রধান কৌশলগত যুক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ১৯৭৭ সালে সিয়াটো বিলুপ্ত হয়। শিক্ষা পরিষ্কার: একই শত্রু আছে এই ধারণা দিয়ে জোট তৈরি করা সহজ; কিন্তু সদস্যদের জাতীয় স্বার্থ যখন ভিন্ন দিকে টানে, তখন সেই জোটের কার্যকারিতা দ্রুত প্রশ্নের মুখে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের অভিজ্ঞতা আরও কাছের সতর্কবার্তা দেয়।
১৯৫০ সালের আরব যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কাগজে-কলমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে একাধিক যুদ্ধ, আক্রমণ ও আঞ্চলিক সংকট সত্ত্বেও এর প্রতিরক্ষা-ধারাগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে একই আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা এবং নিজেদের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতার কারণে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোকে গভীর করা কঠিন।
অতএব ‘একসঙ্গে থাকলে শক্তি বাড়ে’ এই কথাটি সত্য হলেও, জোট কার্যকর হওয়ার জন্য রাজনৈতিক আস্থা ও অভিন্ন নিরাপত্তা ধারণা অপরিহার্য। মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য এখানেই। সৌদি আরব অর্থনৈতিক ও জ¦ালানি শক্তির কেন্দ্র, তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা, আর পাকিস্তান বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র।
এই তিন দেশের সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বাস্তব সুবিধা তৈরি করতে পারে। চুক্তির সদস্যরাও ইতোমধ্যে সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলোÑ কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের মতো মধ্যম শক্তির দেশের জন্য বড় শক্তির সঙ্গে এককভাবে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অনেক সময় বেশি কার্যকর। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্ভাবনা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে স্বাভাবিক সম্পর্কÑ এই তিনটি মাত্রাকে একটি বৃহত্তর কাঠামোয় নেওয়া গেলে ঢাকার কূটনৈতিক পরিসর কিছুটা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্যও নতুন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের দরজা খুলতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনার বিপরীত পিঠেই আছে বড় ঝুঁকি। মক্কা চুক্তির সদস্য তিন দেশের নিরাপত্তা-অগ্রাধিকার বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। সৌদি আরবের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত; তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থ বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস ও আশপাশের অঞ্চলে; পাকিস্তানের নিরাপত্তা ভাবনার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভারত, আফগানিস্তান ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ।
বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তা বাস্তবতা আবার বঙ্গোপসাগর, সীমান্ত, সামুদ্রিক সম্পদ, মিয়ানমার ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীল।



















