শুভ্রর বয়স তেরো বা চৌদ্দ বছর। সে বয়সে কিশোর হলেও তার বুদ্ধিমত্তা বড়দেরও ছাড়িয়ে যায়। যেকোনো কিছু দেখলেই তার মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়— এটি এমন কেন, ওটি কীভাবে হলো, ওই পাহাড়ের ওপারে কী রয়েছে কিংবা ওই নদী কোথা থেকে এসেছে।
আর রাতের আকাশে এত তারা জ্বলে কেন? পাখিরা কীভাবে উড়ে? শুভ্র দেখতে যেমন সুন্দর, স্বভাবেও তেমন মিষ্টি। তার বড় বড় কৌতূহলী চোখ, মুখে সবসময় লেগে থাকে সরল হাসি। গ্রামের সবাই তাকে খুব আদর করে। তবে শুভ্রর একটা বদঅভ্যাসও আছেÑ অজানা জিনিস জানার জন্য সে মাঝে মাঝে বিপদকেও ভয় পায় না। তাদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই ছিল বিশাল এক বন।
গ্রামের মানুষ সেই বনকে বলত গহিন বন। বনের শুরুটা তেমন ভয়ংকর না। দিনের বেলায় অনেকেই সেখানে যায় কাঠ সংগ্রহ করতে কিংবা গরু-ছাগল খুঁজতে। কিন্তু বনের অনেক ভেতরে গেলে জায়গাটা একেবারে বদলে যেত। সূর্যের আলো সেখানে মাটিতে পৌঁছায় না বললেই চলে। বিশাল বিশাল গাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে ওপরে তাকালে মনে হয় সবুজ রঙের একটা বিশাল ছাদ তৈরি হয়েছে।
আর সেই বনের সবচেয়ে গভীরে আছে একটি বিশাল বটগাছ। বটগাছটি এত বড় যে গ্রামের কয়েকজন মানুষ হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালেও তার কা- ঘিরে শেষ করতে পারে না। গ্রামের মানুষ বলে, ওই বটগাছের নিচেই নাকি ভূত, রাক্ষস, জিন, দৈত্যÑসবাই মিলে আস্তানা গড়েছে। শুভ্র প্রথম এসব কথা শুনেছিল তার দাদা ভাইয়ের কাছে। এক সন্ধ্যায় উঠানে বসে দাদা ভাই পুরোনো দিনের গল্প করছিলেন।
শুভ্র জিজ্ঞেস করল, Ñদাদা ভাই, ওই গহিন বনের ভেতরে কেউ যায় না কেন? দাদা ভাই একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, Ñসব জায়গায় যেতে নেইরে শুভ্র। Ñকেন? Ñকারণ সব জায়গা মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। শুভ্রর চোখ আরও বড় হয়ে গেল। Ñওখানে কী আছে? দাদা ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, Ñএকটা বিশাল বটগাছ আছে। তার আশপাশে নাকি অদ্ভুত সব প্রাণী থাকে।
অনেক বছর আগে কাঠুরিয়ারা সেখানে কাঠ কাটতে গিয়ে ভয় পেয়েছে। কেউ কেউ পথ হারিয়েছে। আবার দু-একজন সাহসী মানুষ ফিরে এসে বলেছে, তারা অদ্ভুত সব ছায়া দেখেছে। শুভ্র উত্তেজিত হয়ে বলল, Ñতুমি কি কখনো দেখেছ? দাদা ভাই হেসে বললেন, Ñআমি কি আর তোর মতো বোকা? আমি অত ভেতরে যাইনি! শুভ্র মুখ ভার করে বলল, Ñআমি বোকা নই। Ñজানি।
তুই বুদ্ধিমান। তাই বলছি, ওই বনে একা যাস না। কথাটা শুভ্রর মনে গেঁথে গেল। কিন্তু নিষেধ শুনে তার কৌতূহল কমল না। বরং আরও বেড়ে গেল। সত্যিই কি সেখানে ভূত আছে? সত্যিই কি রাক্ষস থাকে? বটগাছটার নিচে কী হয়? দিনের পর দিন এসব প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরতে লাগল। অবশেষে একদিন সকালে শুভ্র সিদ্ধান্ত নিলÑ সে বনে যাবে। কাউকে কিছু না বলে।
সেদিন বাড়ির সবাই কাজে ব্যস্ত। শুভ্র চুপিচুপি একটা ছোট পানির বোতল নিল, সঙ্গে কিছু মুড়ি আর গুড় রাখল। তারপর হেঁটে রওনা হলো গহিন বনের দিকে। বনের কাছে পৌঁছে প্রথমে তার বুকটা একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে বলল, ‘আমি ভয় পাব না। আমি শুধু দেখে ফিরে আসব। ’ বনের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের শব্দ বদলে গেল। বাইরে গ্রামের মানুষের কথা, গরুর ঘণ্টা, পাখির ডাক, সব ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
এখন শুধু পাতার মর্মর শব্দ। শুভ্র হাঁটতে লাগল। একসময় সে শুনলÑহুঁউউ… কুঁউউ…! শুভ্র থেমে গেল। একটা বিশাল পেঁচা গাছের ডালে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? ’ পেঁচা কোনো উত্তর দিল না। শুধু গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল। শুভ্র আবার হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ তার পায়ের পাশ দিয়ে একটা সাপ দ্রুত চলে গেল।
ভয়ে শুভ্র লাফ দিয়ে কয়েক হাত দূরে সরে গেল। কিছুক্ষণ সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বুঝল সাপটা অনেক দূরে চলে গেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘এই জন্যই তো এসেছি। ভয় পেলে চলবে না। ’ আরও ভেতরে গেল সে। বন ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসছিল। দুপুরের সূর্য তখন মাথার ওপর, অথচ বনের ভেতরে মনে হচ্ছিল সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কোথাও শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ।
কোথাও অচেনা পাখির ডাক। কখনো দূর থেকে মনে হয় কেউ যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। শুভ্রর বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল। তবু সে ফিরে গেল না। কিছুদূর যাওয়ার পর সে কয়েকটি পুরোনো কাঠের গুঁড়ি দেখতে পেল। তার পাশে পড়ে আছে মানুষের ব্যবহৃত কিছু পুরোনো জিনিস। দেখে মনে হলো বহু বছর আগে কেউ এখানে এসেছিল। শুভ্র এবার সত্যিই ভয় পেল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আল্লাহ, আমাকে নিরাপদে রেখ।
’ তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগোল। হঠাৎÑ,ধপ! সামনের ঝোপের ভেতর কিছু একটা পড়ল। শুভ্র পিছিয়ে গেল। ঝোপ নড়ছে। তারপর বেরিয়ে এল একটা বড় বনবিড়াল। শুভ্র হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বনবিড়ালটা কিছুক্ষণ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থেকে দৌড়ে চলে গেল। শুভ্র এবার একটু হেসে ফেলল আর মনে মনে বলল, ‘আমি তো ভাবলাম ভূত! ’ কিন্তু তার হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
কারণ ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ। হো… হো… হো… তারপর যেন অনেকগুলো গলা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। শুভ্রর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সে হয়তো বনের সেই জায়গার খুব কাছে চলে এসেছে। আরও কিছুদূর এগিয়ে যেতেই গাছপালা একটু ফাঁকা হলো। সামনে দেখা গেল বিশাল একটি পাথরের ফটক। ফটকের ওপরে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন আঁকা। আর ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেÑ এক বিশাল দৈত্য!
দৈত্যটি এত লম্বা যে শুভ্রকে তার সামনে দাঁড় করালে মনে হবে ছোট্ট একটা পুতুল। তার মাথায় বড় শিংয়ের মতো দুটো বাঁকা চুল, গায়ে বিশাল চাদর। হাতে লম্বা একটা লাঠি। শুভ্রর হাঁটু কাঁপতে লাগল।


















