মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। এবার কি সরাসরি মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আঞ্চলিক দুই পরাশক্তি সৌদি আরব এবং ইরান? ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজে অবরোধ, আর সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার পর পরিস্থিতি এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, হুথিদের এই আকস্মিক উত্তেজনার পেছনে আসলে কে রয়েছে এবং ইরান কি তবে সৌদি আরবকে যুদ্ধে টেনে আনছে?
ইয়েমেনে তাণ্ডব ও সৌদিতে হামলা
ঘটনার সূত্রপাত খুব সম্প্রতি। ইয়েমেনের হাদ্রামাউত ও মারিব প্রদেশে হুথি বিদ্রোহীরা হঠাৎ করেই এক ডজনেরও বেশি মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালায়। সরকারি বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে যখন শত শত সেনা সকালে মহড়া দিচ্ছিল, ঠিক তখনই আছড়ে পড়ে হুথিদের মিসাইল। এতে ঘটনাস্থলেই অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত হন, আহত হন আরও অনেকে। এখানেই শেষ নয়। সীমান্ত পার হয়ে হুথিদের মিসাইল গিয়ে আঘাত হানে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশে। বেসামরিক এই এলাকায় চার বছরের এক শিশুসহ অন্তত ১১ জন আহত হন।
হুথিদের দাবি, সৌদি আরব নাকি তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সে কারণেই তারা এই পূর্বপ্রস্তুতিমূলক হামলা চালিয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, গল্পটা শুধুই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নয়, এর শিকড় অনেক গভীরে।
হঠাৎ করে ইয়েমেন এবং সৌদি আরবে হুথিদের এই উসকানিমূলক হামলার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, স্থানীয় সমীকরণ। ২০২২ সালের পর থেকে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে যে অঘোষিত যুদ্ধবিরতি চলছিল, তা এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং বড় একটি অংশ এখনো হুথিদের দখলে। রাজনৈতিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় হুথিরা মনে করছে, সৌদি আরবের ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়ে নিজেদের দাবি আদায় করার এটাই উপযুক্ত সময়।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক সমীকরণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনা নতুন মোড় নেওয়ার পর থেকেই পুরো অঞ্চল উত্তপ্ত। আর ইরান সমর্থিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’–এর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হলো এই হুথি গোষ্ঠী। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইয়েমেন সরকার সানা বিমানবন্দরে ইরান থেকে আসা একটি বিমান অবতরণে বাধা দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল, ইরান ওই বিমানে করে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছিল। ব্যাস! অমনি ক্ষেপে ওঠে হুথিরা। তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। শুধু তা-ই নয়, লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে মিসাইল হামলা চালিয়ে এবং বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান রুট ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরান কীভাবে এখানে জড়িয়ে আছে? গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সরাসরি তত্ত্বাবধানে হুথি এবং ইরাকের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী একজোট হচ্ছে। তারা যৌথভাবে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র, বন্দর এবং বিমানবন্দরে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর ছক কষছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান আগে আড়ালে থেকে হুথিদের সহায়তা করলেও, এখন আর লুকোছাপা করছে না। হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরের ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে তারা দেখিয়ে দিতে চায়—বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি এখনো তাদের হাতেই রয়েছে।
তাহলে সৌদি আরব এখন কী করছে? সৌদি আরব এতদিন ধরে ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়ে আসছিল। তারা কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ায় রিয়াদও এখন কঠোর অবস্থানের দিকে হাঁটছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ইতিমধ্যে ১৩টি দেশকে নিয়ে নতুন একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠন করেছে। পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যদি হুথিরা এভাবে তাদের তেলক্ষেত্র ও বিমানবন্দরে হামলা চালাতে থাকে, তবে সৌদি আরব আর বসে থাকবে না। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে সমন্বয় করে তারা ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে ফের সর্বাত্মক বিমান ও পদাতিক অভিযান শুরু করতে পারে।
যদি সত্যি সত্যি ইয়েমেনে আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খাবে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ কনটেইনার এবং ১৫ শতাংশের বেশি তেল পরিবহন হয় যে লোহিত সাগর দিয়ে, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহল উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি বলছে—ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সৌদি আরব ও ইরানের এই ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ যদি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে।
















