আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা এমন একটি সম্পদ, যা অর্থ কিংবা সামরিক শক্তি দিয়ে সহজে অর্জন করা যায় না। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নীতির ধারাবাহিকতার ওপরই সেই আস্থা গড়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর এবং একই সময়ে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা এক ধাপ শিথিল হওয়ার ঘটনাকে নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি বার্তা, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। এ বাস্তবতায় কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক আন্তর্জাতিক ধারণা তৈরি হওয়া একটি বড় অর্জন। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে নতুন আস্থা প্রকাশ করে থাকে, তবে সেটিকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দেওয়াই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ভ্রমণ সতর্কতা হ্রাসের তাৎপর্য কেবল পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা সংস্থা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। ফলে এমন একটি সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক সফর এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের আলোচনায় কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এগুলো নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময় খাত। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা এবং উৎপাদন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা দিয়ে আসে না, প্রয়োজন কার্যকর নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান। সরকার যদি সত্যিই সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা বন্দর সচল রাখা, জ্বালানি সরবরাহ উন্নত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে সেটি শুধু মার্কিন বিনিয়োগ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদ্যোক্তাদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেন। আামদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক আস্থা টেকসই হয় দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার ওপর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, আইনের শাসন, স্বচ্ছ প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে বিদেশি আস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কূটনৈতিক অর্জন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিফলিত হবে। সার্জিও গোরের সফর এবং এর পরবর্তী ইতিবাচক বার্তাগুলোকে তাই কেবল কূটনৈতিক সাফল্যের প্রচারণা হিসেবে নয়, বরং একটি দায়িত্ব ও সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। এই আস্থাকে বাস্তব বিনিয়োগে, বিনিয়োগকে শিল্পায়নে এবং শিল্পায়নকে কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারলেই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে। কারণ আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই আস্থাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো। আর সেই কাজটি করার এখনই উপযুক্ত সময়।
4:48 am, Monday, 3 August 2026
শিরোনাম :













