জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত দিন। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়ন অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে রাজপথে আরও জোরালো হয় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ। নিহতদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন নতুন কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হয়। এদিনই ৪ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা আসে, পরবর্তী দুই দিন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নির্ধারক ভূমিকা রাখে। এদিন সিলেটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণমিছিলকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপুরের নামাজের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষার্থীদের জমায়েত শুরু হয়। পরে মিছিলটি মদিনা মার্কেট অভিমুখে অগ্রসর হলে পুলিশ বাধা দেয়। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও শটগানের গুলি ছুঁড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তবে শিক্ষার্থীরা পিছু না হটে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা ও বাগবাড়ী এলাকায়। রাত পর্যন্ত থেমে থেমে চলা এ সংঘর্ষে পুলিশ বিশেষায়িত ইউনিট ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করলেও গলিপথে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে আহত হন ১২ বছর বয়সি শিশু শফিক আলী, বার্তা২৪-এর সিলেট প্রতিনিধি মোশাহিদ আলীসহ কয়েকজন। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সেদিন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং পাড়া-মহল্লার নারী-পুরুষ। পুলিশের ধাওয়া থেকে বাঁচতে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীকে একটি বাসার বাসিন্দারা রক্ষা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ছিল, ওই বাসার প্রবীণ গৃহবধূ সাহেদা খান পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়লে অভিযান চালানো থেকে সরে আসে পুলিশ। পরে সেদিন রাতে একটি বিয়ের গাড়িতে করে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করেন। একই দিনে হবিগঞ্জেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সিলেটের টুকেরবাজার এলাকার বাসিন্দা মোস্তাক আহমদ (২৪) নিহত হন। রাতভর সিলেট মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড চালিয়ে শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। ২ আগস্ট (৩৩ জুলাই) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় আরও দুজন নিহত হন। এসব ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার পর্যন্ত ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কবিতা আবৃত্তি, গণসংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা ৪ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। একই সময়ে প্রায় সাত ঘণ্টার জন্য আবারও ফেসবুক বন্ধ রাখা হয়। ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ক অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি চাপ দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং প্রচারিত বক্তব্য স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি। এদিকে চলমান সহিংসতার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৭৮ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে জামিন পান। একই দিনে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানায়, জুলাই মাসজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটি এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং দ্রুত শিক্ষার্থীদের নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানায়। রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার আহ্বান জানিয়ে গণভবনের দরজা খোলা থাকার কথা বলেন। তবে রাজপথে তখন আন্দোলনকারীদের একটাই বার্তা – হত্যা ও দমন-পীড়নের বিচার এবং গণদাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না।
3:22 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :



















