আলু উৎপাদনে টানা দুই বছর উদ্বৃত্ত থাকলেও কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার শিল্প এখন গভীর আর্থিক সংকটের মুখে রয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা আর সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, ২০২৫ সালে সরকার প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করলেও চলতি বছরে ব্যয় আরও বেড়েছে। কিন্তু সেই ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় অধিকাংশ হিমাগার লোকসানের মুখে পড়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এ বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ টন বেশি। ওই বছর দেশের ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। তবে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য পাননি এবং উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। চলতি বছরও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ টন বেশি। এ বছরও ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে হিমাগার শিল্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ট্যারিফ ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, লুব্রিকেন্ট, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি। সংগঠনটি জানায়, তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আবেদন করেছে। এমনকি একটি কারিগরি কমিটিও বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে। তবুও এখন পর্যন্ত সরকার নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেনি। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, একটি ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারে ব্যাংক ঋণের সুদ ও কিস্তি এবং বিদ্যুৎ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭ টাকা ১১ পয়সা। এর সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, লুব্রিকেন্টসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি কেজিতে প্রায় ৯ টাকা ৬২ পয়সা। অথচ সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হওয়ায় অধিকাংশ হিমাগার লোকসান গুনছে। অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য, এই অবস্থায় অনেক মালিক নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে তারা ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছেন। এদিকে সংবাদ সম্মেলনে হিমাগার মালিকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করা হয়। সংগঠনটির দাবি, সরকার নির্ধারিত ৬ টাকা ৭৫ পয়সার বেশি ভাড়া কোনো হিমাগার নেয়নি। কিছু ব্যক্তি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ কৃষক ও প্রশাসনকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়। সংগঠনটির মতে, পরিচালন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনা করে আলু সংরক্ষণ ভাড়া যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হলে হিমাগার শিল্প টিকে থাকবে এবং কৃষকরাও দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন। অন্যথায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত এই খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
3:05 am, Sunday, 2 August 2026
শিরোনাম :











