বর্ষা শুরু হলেই দেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়ে যায়। এ সময় বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার বিস্তার রোধ এবং জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মশাবাহিত রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে—DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর ভাইরাসটি মশার শরীরে ৮ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত সক্রিয় হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকে। এরপর সেই মশা কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে ভাইরাসটি তার শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। ডেঙ্গু একজন মানুষের কাছ থেকে আরেকজনের শরীরে সরাসরি ছড়ায় না; এটি কেবল সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমেই ছড়ায়। সাধারণত আক্রান্ত মশার কামড়ের ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগীর হঠাৎ ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও গাঁটে প্রচণ্ড ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, তীব্র দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ কমে যাওয়া, শরীরে শীতলতা অনুভব করা এবং হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনও দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু সাধারণত দুই ধরনের— ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার। ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুতে অধিকাংশ রোগী ২ থেকে ৭ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, প্লেটলেট কমে যাওয়া, রক্তের প্লাজমা লিকেজ এবং রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গুর কিছু বিপদসংকেত রয়েছে, যেগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অনবরত বমি, তীব্র পেটব্যথা, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, প্রস্রাব বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অচেতনভাব। বর্ষাকালে অনেকেই সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর ও ডেঙ্গুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। সাধারণ জ্বর সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কমে আসে। কিন্তু ডেঙ্গুতে উচ্চমাত্রার জ্বরের পাশাপাশি চোখের পেছনে ব্যথা, তীব্র শরীরব্যথা, র্যাশ এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই বর্ষাকালে যেকোনো জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গু শনাক্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা, CBC, SGPT, SGOT এবং প্রয়োজনে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনে এক্স-রে, ইসিজি বা আল্ট্রাসনোগ্রামও করানো হতে পারে। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী দেওয়া হয়। জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। তবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা অন্যান্য NSAID-জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রচুর পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকরা আরও পরামর্শ দেন, ডেঙ্গু রোগীর খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, ডাল, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার রাখা উচিত। তবে পেঁপে পাতার রস, ছাগলের দুধ বা বিভিন্ন ভেষজ খাদ্য প্লেটলেট বাড়ায়— এমন দাবির পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই এসবের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাই নিরাপদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক বছরের কম বয়সী শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ কারণে এসব রোগীর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা প্রয়োজন। ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এসির ট্রে ও ফ্রিজের নিচে যেন কোথাও পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করাও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে কোনো জ্বরকেই অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত পরীক্ষা, সময়মতো চিকিৎসা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেই ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
6:29 pm, Saturday, 1 August 2026
শিরোনাম :
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন কি না—কীভাবে বুঝবেন?
-
MIT ERP
- Update Time : 05:31:08 pm, Saturday, 1 August 2026
- 2
Tag :
Popular Post





















