আজ শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩৪°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১৮%

বুলিং: বদলে যাওয়া আচরণের অদৃশ্য ক্ষত

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:52:56 am, Saturday, 3 October 2026
  • 21

বুলিং: বদলে যাওয়া আচরণের অদৃশ্য ক্ষত

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মজা করছিলাম—কত সহজেই এই দুটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে যায় একটি মানুষের অপমান, কষ্ট কিংবা ভেঙে পড়ার গল্প। ছোটবেলায় বন্ধুর চেহারা, গায়ের রং, শরীর, পোশাক কিংবা পড়াশোনা নিয়ে করা ঠাট্টা থেকে শুরু হয় যে আচরণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা যে থেমে যায়—এমনটা নয়।

বরং বদলে যায় তার ভাষা, কৌশল এবং প্রকাশের ধরন। কখনো বন্ধুরা একজনকে দল থেকে এড়িয়ে যায়, কখনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করে, আবার কখনো গুজব ছড়িয়ে বা সবার সামনে হেয় করে। শুধু সহপাঠী নয়, শিক্ষকদেরও কখনো শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন মন্তব্য করতে দেখা যায়, যা বারবার শুনতে শুনতে সেই শিক্ষার্থীর জন্য অপমান ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-ি পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রেও একই আচরণ নতুন রূপে দেখা যায়Ñ সহকর্মীকে সবার সামনে ছোট করা, অযৌক্তিক কাজের চাপ দেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে দূরে রাখা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসে সেই আচরণকে আরও বিস্তৃত করেছে; ভুয়া পরিচয়, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গুজব, অপমানজনক ছবি কিংবা ধারাবাহিক হয়রানির মাধ্যমে একজন মানুষকে তার নিজের ঘরেও অস্বস্তি ও অনিরাপত্তার মধ্যে রাখা সম্ভব।

তাহলে কি বয়স বাড়ার সঙ্গে বুলিং সত্যিই শেষ হয়? নাকি শুধু তার ভাষা, ধরন ও ক্ষমতার কাঠামো বদলে যায়? শৈশব ও কৈশোরে বুলিংকে অনেক সময় খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ‘বাচ্চারা তো এমন করেই’, ‘একটু মজা করেছে’, ‘এগুলো নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’Ñ এ ধরনের কথায় সমস্যাটিকে ছোট করে দেখা হয়।

অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বুলিং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের প্রতি সাতজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, আর বুলিংসহ সহিংসতা ও সামাজিক বর্জন এসব সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সমস্যার জায়গাটি এখানেইÑ আমরা অনেক সময় আচরণটির প্রভাব দিয়ে নয়, উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করি।

যে ব্যক্তি অপমান করেছে, সে হয়তো বলছে তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না; সে তো শুধু মজা করেছে। কিন্তু যার দিকে কথাটি ছোড়া হয়েছে, তার কাছে সেই কথার প্রভাব কী ছিল, সেটিও তো গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুত্বের নামে নিয়মিত কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা, তার দুর্বলতা নিয়ে অন্যদের সামনে কথা বলা কিংবা তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দল থেকে দূরে রাখাÑ এসবকে শুধু ‘খুনসুটি’ বলে পাশ কাটিয়ে গেলে সমস্যাটি আরও গভীরে যায়।

কারণ বারবার একই আচরণের মুখোমুখি হলে একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যেতে পারে এবং পড়াশোনা বা কাজেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুলিংয়ের ধরন আরও সূক্ষ্ম হতে পারে। এখানে হয়তো কেউ সরাসরি ‘তুমি এমন’ বলে না; বরং গুজব ছড়ায়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা হয়, সম্পর্ক বা পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করা হয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা হয়।

কাউকে দলীয় কার্যক্রমে না নেওয়া, ইচ্ছা করে একা করে রাখা কিংবা তার বক্তব্যকে বারবার উপহাস করাÑ এসবও একজন শিক্ষার্থীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণাতেও বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও শিক্ষাগত সাফল্যের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে ভাবার মতো।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যেমন সহপাঠীর কাছ থেকে বুলিংয়ের শিকার হতে পারে, তেমনি ক্ষমতার অবস্থানে থাকা শিক্ষক বা অন্য কোনো ব্যক্তির আচরণও কখনো শিক্ষার্থীর জন্য অপমানজনক হয়ে উঠতে পারে। একজন শিক্ষকের একটি মন্তব্য হয়তো তার কাছে সামান্য, কিন্তু একই মন্তব্য যদি শ্রেণিকক্ষে সবার সামনে বারবার করা হয়, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান ও মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যেহেতু সমান ক্ষমতার সম্পর্ক নয়, তাই এখানে কথার প্রভাবও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দেওয়া বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার সঙ্গে তাকে অপমান করা এক বিষয় নয়। বুলিংয়ের এই পরিবর্তিত রূপ কর্মজীবনেও দেখা যায়। স্কুলের বেঞ্চ বদলে যায় অফিসের ডেস্কে, সহপাঠীর জায়গায় আসে সহকর্মী, আর পরীক্ষার ফলের জায়গায় আসে কাজের মূল্যায়ন।

কিন্তু ক্ষমতার অসমতা থেকে যায়। কারো কাজ নিয়ে সবার সামনে অপমান করা, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়া, অসম্ভব সময়সীমার কাজ চাপিয়ে দেওয়া, ছোট ভুলকে বড় করে দেখানো কিংবা পদমর্যাদার ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে ক্রমাগত ভয় বা অস্বস্তির মধ্যে রাখাÑ এসবকে শুধু ‘অফিসের চাপ’ বলে স্বাভাবিক করে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির মধ্যে এমন আচরণকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা একবার বা বারবার ঘটে এবং শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এর আওতায় শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণরত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। বুলিংয়ের সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সামনাসামনি অপমানের একটি সীমা আছে; কিন্তু অনলাইনে একটি মন্তব্য, ছবি বা গুজব মুহূর্তের মধ্যে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা, অন্যের নামে বার্তা পাঠানো, অপমানজনক ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, মিথ্যা তথ্য প্রচার করা কিংবা বারবার নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকাÑ এসবই সাইবার বুলিংয়ের বিভিন্ন রূপ।

ইউনিসেফও এসব আচরণকে সাইবার বুলিংয়ের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতাতেও বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি জরিপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকে সবচেয়ে চাপ সৃষ্টিকারী অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রায় এক-অষ্টমাংশ অংশগ্রহণকারী।

অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়; অনেকের জন্য এটি মানসিক চাপেরও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তবে বুলিংয়ের আলোচনায় শুধু বুলিকে বা যে ব্যক্তি বুলিং করছে, তাকে দেখলেই হবে না। আশপাশের মানুষগুলোকেও দেখতে হবে। কেউ একজনকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, অন্যরা হাসছে; কেউ অপমান করছে, বাকিরা চুপ করে আছে; কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে, আর অন্যরা সেটিকে বিনোদন হিসেবে দেখছেÑ এই নীরবতাও অনেক সময় আচরণটিকে টিকিয়ে রাখে।

একটি মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তাকে অপমান করা হলেও কেউ আপত্তি করবে না, তখন বুলিং আরও সহজ হয়ে যায়। তাই বুলিং বন্ধ করার প্রথম ধাপ হয়তো আইন বা শাস্তি নয়; প্রথম ধাপ হলোÑ আচরণটিকে তার প্রকৃত নামে চেনা। মজা আর অপমান এক নয়। বন্ধুত্ব আর হেয় করা এক নয়। শাসন আর অপদস্থ করা এক নয়। কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব আর ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে মানসিক চাপে রাখা এক নয়।

একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর কাউকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে অপমান করা এক বিষয় নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে দায়িত্ব আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করলে যেন ভুক্তভোগীকেই আবার প্রশ্নবিদ্ধ হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে স্পষ্ট আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

অনলাইনেও দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ শুধু বুলিংকারীকে থামালেই হবে না; যে পরিবেশে বুলিংকে স্বাভাবিক মনে করা হয়, সেই মানসিকতাকেও বদলাতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘কে কাকে বুলিং করল’Ñ এখানে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কেন এমন আচরণকে এত সহজে মেনে নিই? কেন কারো চেহারা, পোশাক, ফল, ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক অবস্থান বা দুর্বলতা নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার নিজেদের দিয়ে দিই?

আর কেন ভুক্তভোগী প্রতিবাদ করলে তাকেই বলা হয়Ñ ‘এতকিছু মনে করার কী আছে? ’ বয়স বাড়লে হয়তো স্কুলের মাঠ থাকে না, শ্রেণিকক্ষ বদলে যায় কর্মক্ষেত্রে, আর মুখোমুখি কথোপকথনের জায়গা নেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু কাউকে ছোট করার প্রবণতা যদি বদলাতে না পারে, তাহলে বুলিংও শেষ হয় না। বয়সের সঙ্গে বুলিং অদৃশ্য হয় না; বরং তার ধরন, ভাষা ও ক্ষমতার কাঠামো বদলে যায়।

তাই শুধু বুলিংয়ের শিকার মানুষকে ‘শক্ত হতে’ বলার আগে আমাদের নিজেদের আচরণ, নীরবতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির জায়গাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

বুলিং: বদলে যাওয়া আচরণের অদৃশ্য ক্ষত

Update Time : 04:52:56 am, Saturday, 3 October 2026

মজা করছিলাম—কত সহজেই এই দুটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে যায় একটি মানুষের অপমান, কষ্ট কিংবা ভেঙে পড়ার গল্প। ছোটবেলায় বন্ধুর চেহারা, গায়ের রং, শরীর, পোশাক কিংবা পড়াশোনা নিয়ে করা ঠাট্টা থেকে শুরু হয় যে আচরণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা যে থেমে যায়—এমনটা নয়।

বরং বদলে যায় তার ভাষা, কৌশল এবং প্রকাশের ধরন। কখনো বন্ধুরা একজনকে দল থেকে এড়িয়ে যায়, কখনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করে, আবার কখনো গুজব ছড়িয়ে বা সবার সামনে হেয় করে। শুধু সহপাঠী নয়, শিক্ষকদেরও কখনো শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন মন্তব্য করতে দেখা যায়, যা বারবার শুনতে শুনতে সেই শিক্ষার্থীর জন্য অপমান ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-ি পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রেও একই আচরণ নতুন রূপে দেখা যায়Ñ সহকর্মীকে সবার সামনে ছোট করা, অযৌক্তিক কাজের চাপ দেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে দূরে রাখা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসে সেই আচরণকে আরও বিস্তৃত করেছে; ভুয়া পরিচয়, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গুজব, অপমানজনক ছবি কিংবা ধারাবাহিক হয়রানির মাধ্যমে একজন মানুষকে তার নিজের ঘরেও অস্বস্তি ও অনিরাপত্তার মধ্যে রাখা সম্ভব।

তাহলে কি বয়স বাড়ার সঙ্গে বুলিং সত্যিই শেষ হয়? নাকি শুধু তার ভাষা, ধরন ও ক্ষমতার কাঠামো বদলে যায়? শৈশব ও কৈশোরে বুলিংকে অনেক সময় খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ‘বাচ্চারা তো এমন করেই’, ‘একটু মজা করেছে’, ‘এগুলো নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’Ñ এ ধরনের কথায় সমস্যাটিকে ছোট করে দেখা হয়।

অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বুলিং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের প্রতি সাতজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, আর বুলিংসহ সহিংসতা ও সামাজিক বর্জন এসব সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সমস্যার জায়গাটি এখানেইÑ আমরা অনেক সময় আচরণটির প্রভাব দিয়ে নয়, উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করি।

যে ব্যক্তি অপমান করেছে, সে হয়তো বলছে তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না; সে তো শুধু মজা করেছে। কিন্তু যার দিকে কথাটি ছোড়া হয়েছে, তার কাছে সেই কথার প্রভাব কী ছিল, সেটিও তো গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুত্বের নামে নিয়মিত কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা, তার দুর্বলতা নিয়ে অন্যদের সামনে কথা বলা কিংবা তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দল থেকে দূরে রাখাÑ এসবকে শুধু ‘খুনসুটি’ বলে পাশ কাটিয়ে গেলে সমস্যাটি আরও গভীরে যায়।

কারণ বারবার একই আচরণের মুখোমুখি হলে একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যেতে পারে এবং পড়াশোনা বা কাজেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুলিংয়ের ধরন আরও সূক্ষ্ম হতে পারে। এখানে হয়তো কেউ সরাসরি ‘তুমি এমন’ বলে না; বরং গুজব ছড়ায়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা হয়, সম্পর্ক বা পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করা হয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা হয়।

কাউকে দলীয় কার্যক্রমে না নেওয়া, ইচ্ছা করে একা করে রাখা কিংবা তার বক্তব্যকে বারবার উপহাস করাÑ এসবও একজন শিক্ষার্থীর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণাতেও বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও শিক্ষাগত সাফল্যের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে ভাবার মতো।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যেমন সহপাঠীর কাছ থেকে বুলিংয়ের শিকার হতে পারে, তেমনি ক্ষমতার অবস্থানে থাকা শিক্ষক বা অন্য কোনো ব্যক্তির আচরণও কখনো শিক্ষার্থীর জন্য অপমানজনক হয়ে উঠতে পারে। একজন শিক্ষকের একটি মন্তব্য হয়তো তার কাছে সামান্য, কিন্তু একই মন্তব্য যদি শ্রেণিকক্ষে সবার সামনে বারবার করা হয়, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান ও মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যেহেতু সমান ক্ষমতার সম্পর্ক নয়, তাই এখানে কথার প্রভাবও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দেওয়া বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার সঙ্গে তাকে অপমান করা এক বিষয় নয়। বুলিংয়ের এই পরিবর্তিত রূপ কর্মজীবনেও দেখা যায়। স্কুলের বেঞ্চ বদলে যায় অফিসের ডেস্কে, সহপাঠীর জায়গায় আসে সহকর্মী, আর পরীক্ষার ফলের জায়গায় আসে কাজের মূল্যায়ন।

কিন্তু ক্ষমতার অসমতা থেকে যায়। কারো কাজ নিয়ে সবার সামনে অপমান করা, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়া, অসম্ভব সময়সীমার কাজ চাপিয়ে দেওয়া, ছোট ভুলকে বড় করে দেখানো কিংবা পদমর্যাদার ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে ক্রমাগত ভয় বা অস্বস্তির মধ্যে রাখাÑ এসবকে শুধু ‘অফিসের চাপ’ বলে স্বাভাবিক করে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির মধ্যে এমন আচরণকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা একবার বা বারবার ঘটে এবং শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এর আওতায় শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণরত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। বুলিংয়ের সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সামনাসামনি অপমানের একটি সীমা আছে; কিন্তু অনলাইনে একটি মন্তব্য, ছবি বা গুজব মুহূর্তের মধ্যে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা, অন্যের নামে বার্তা পাঠানো, অপমানজনক ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, মিথ্যা তথ্য প্রচার করা কিংবা বারবার নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকাÑ এসবই সাইবার বুলিংয়ের বিভিন্ন রূপ।

ইউনিসেফও এসব আচরণকে সাইবার বুলিংয়ের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতাতেও বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি জরিপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকে সবচেয়ে চাপ সৃষ্টিকারী অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রায় এক-অষ্টমাংশ অংশগ্রহণকারী।

অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়; অনেকের জন্য এটি মানসিক চাপেরও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তবে বুলিংয়ের আলোচনায় শুধু বুলিকে বা যে ব্যক্তি বুলিং করছে, তাকে দেখলেই হবে না। আশপাশের মানুষগুলোকেও দেখতে হবে। কেউ একজনকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, অন্যরা হাসছে; কেউ অপমান করছে, বাকিরা চুপ করে আছে; কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে, আর অন্যরা সেটিকে বিনোদন হিসেবে দেখছেÑ এই নীরবতাও অনেক সময় আচরণটিকে টিকিয়ে রাখে।

একটি মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তাকে অপমান করা হলেও কেউ আপত্তি করবে না, তখন বুলিং আরও সহজ হয়ে যায়। তাই বুলিং বন্ধ করার প্রথম ধাপ হয়তো আইন বা শাস্তি নয়; প্রথম ধাপ হলোÑ আচরণটিকে তার প্রকৃত নামে চেনা। মজা আর অপমান এক নয়। বন্ধুত্ব আর হেয় করা এক নয়। শাসন আর অপদস্থ করা এক নয়। কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব আর ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে মানসিক চাপে রাখা এক নয়।

একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর কাউকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে অপমান করা এক বিষয় নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে দায়িত্ব আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করলে যেন ভুক্তভোগীকেই আবার প্রশ্নবিদ্ধ হতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে স্পষ্ট আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

অনলাইনেও দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ শুধু বুলিংকারীকে থামালেই হবে না; যে পরিবেশে বুলিংকে স্বাভাবিক মনে করা হয়, সেই মানসিকতাকেও বদলাতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘কে কাকে বুলিং করল’Ñ এখানে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কেন এমন আচরণকে এত সহজে মেনে নিই? কেন কারো চেহারা, পোশাক, ফল, ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক অবস্থান বা দুর্বলতা নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার নিজেদের দিয়ে দিই?

আর কেন ভুক্তভোগী প্রতিবাদ করলে তাকেই বলা হয়Ñ ‘এতকিছু মনে করার কী আছে? ’ বয়স বাড়লে হয়তো স্কুলের মাঠ থাকে না, শ্রেণিকক্ষ বদলে যায় কর্মক্ষেত্রে, আর মুখোমুখি কথোপকথনের জায়গা নেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু কাউকে ছোট করার প্রবণতা যদি বদলাতে না পারে, তাহলে বুলিংও শেষ হয় না। বয়সের সঙ্গে বুলিং অদৃশ্য হয় না; বরং তার ধরন, ভাষা ও ক্ষমতার কাঠামো বদলে যায়।

তাই শুধু বুলিংয়ের শিকার মানুষকে ‘শক্ত হতে’ বলার আগে আমাদের নিজেদের আচরণ, নীরবতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির জায়গাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।