দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত মুশফিকুর রহমান ঢাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর পর উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনার পর তার মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তা ছাড়া কলকাতার চিকিৎসা আর ঢাকার চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে খুব একটা তফাত দেখতে পাননি তিনি। তাই চেন্নাইয়ে চলে যান চিকিৎসা নিতে। সেখানকার চিকিৎসাব্যবস্থা, পরিবেশ, ডাক্তার-নার্সদের ব্যবহার— সব দিক দিয়েই অনেক উন্নতমানের মনে হয়েছে মুশফিকুর রহমানের কাছে। এ ছাড়া আরও যারা চেন্নাই, বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদে চিকিৎসা নিতে যান, তাদের মতামতও মুশফিকুরের মতোই।
এদিকে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানো প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্য কলকাতার একটি হোটেলে এক বড় অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় পৌরসভা কঠোর অভিযান চালায়। অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈধ লাইসেন্স না থাকায় প্রায় ৯ শতাধিক কম বাজেটের হোটেল এবং গেস্টহাউস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হোটেল ও গেস্টহাউসে প্রশাসনিক কড়াকড়ির জেরে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
সাম্প্রতিক অভিযানে বহু হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাশ্রয়ী থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। কলকাতার একটি গণমাধ্যমে তেমনই এক ভুক্তভোগী রোগী জানিয়েছেন, আগস্টের শেষে ক্যানসার আক্রান্ত ভাইকে নিয়ে তিনি কলকাতায় যান। অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরও প্রথম রাতেই একটি গেস্টহাউস থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়। পরে আশপাশে থাকার জায়গা না পেয়ে রোগীসহ পরিবার নিয়ে ফুটপাতে রাত কাটাতে হয় তাকে।
এসব ভোগান্তি থেকে বাঁচতে কলকাতা থেকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষ। এদিকে কলকাতার চিকিৎসার মান ও অতিরিক্ত খরচ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাই বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের রোগীরা এখন ভারতের দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরগুলোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ভৌগোলিক নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগের কারণে বাংলাদেশিরা দেশটির অন্য রাজ্যে যেতে চাইছেন।
কলকাতার বেশ কিছু নামী বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল পরীক্ষা করানো এবং বিল বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ অনেক দিন ধরেই। সম্প্রতি হোটেলে আগুন লাগাকে কেন্দ্র করে গেস্টহাউসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কলকাতায় চিকিৎসা নিতে আসা বাংলাদেশি রোগীরা তীব্র আবাসন সংকটে পড়েছেন। বর্তমানে ভারতীয় ভিসাপ্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতার কারণে এমনিতেই ভারতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে কিছুটা সীমিত।
এই পরিস্থিতিতে যারা জরুরি চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন, তারা কলকাতার চেয়ে চিকিৎসায় অধিক নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ হিসেবে চেন্নাই বা দিল্লিকে বেছে নিচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতার কয়েকটি করপোরেট হাসপাতাল অনুমোদিত গেস্টহাউসের সঙ্গে চুক্তি করছে বলে কলকাতার বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশি রোগীদের আগেই নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সর্বভারতীয় একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উডল্যান্ডস হাসপাতালের সিইও রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাব। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যারা আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসছেন, তাদের কাছে আলিপুর অঞ্চলের বেশ কিছু গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ মেনে রওনা হওয়ার আগেই যাতে তারা থাকার জায়গা বুক করতে পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। এরই মধ্যে অনেকেই বুক করে ফেলেছেন, অন্যরা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য চেয়েছেন। ’ এদিকে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানোর বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা, চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থার স্বল্পতা, সর্বোপরি স্বস্তির অভাবেই অসংখ্য লোক দেশের বাইরে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে, এগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের মাধ্যমে রোগীদের বিদেশমুখিতা হ্রাস করা সম্ভব।
দেশে পরিচালিত ল্যাবরেটরিগুলোর মান উন্নয়নের ওপরও তিনি জোর দেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি সর্বদা পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, এমন অবস্থায় বর্তমানে আমরা প্রত্যশা করছি আগামী ২৫ বছর পর এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে, তাই সেরা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি গ্রহণ করার জন্য আমাদের একটি সঠিক পাঠ্যক্রম থাকা জরুরি।
দেশে পরিচালিত ল্যাবরেটরিগুলোর মান উন্নয়ন, বাজেট সহায়তা বাড়ানোর মাধ্যমে চিকিৎসাশাস্ত্রের গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের শক্তিশালীকরণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডা. লেনিন।






















