রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) আর্থিক সূচকে গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৮৫৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একই সময়ে নিট লোকসান কমেছে ১৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, জোনভিত্তিক তদারকি, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নির্দেশনা এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের ফলে এ অগ্রগতি এসেছে। ১৯৮৭ সালের ১৫ মার্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে আসছে রাকাব। ব্যাংক সূত্রের দাবি, অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আর্থিক সূচকে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
সর্বশেষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত গভর্নর সভায়ও রাকাবের অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক সূত্র। রাকাবের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৮৫৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এটি সর্বোচ্চ অর্জন। অন্যদিকে, গত অর্থবছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ২৮৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নিট লোকসান কমেছে ১৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এদিকে, শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরে প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৭০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৬৮৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রভিশন কমেছে ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
ব্যাংক সূত্রের দাবি, বর্তমানে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি হলেও রাকাবের শ্রেণিকৃত ঋণের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। তবে এ তুলনার বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা উৎস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। কৃষকদের ঋণভার কমাতেও উদ্যোগ নিয়েছে রাকাব। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করেছে ব্যাংকটি।
এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কৃষক পরিবারের ২২৭ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক সূত্র। ব্যাংকের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নতুন অর্গানোগ্রাম, গৃহনির্মাণ ঋণ নীতিমালা ও মোটরসাইকেল ঋণ নীতিমালাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত ৩ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের আওতায় নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে বিরোধের অভিযোগও উঠেছে।
রাকাবের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, একটি গোষ্ঠী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করছে। বদলি বাণিজ্যসহ অনৈতিক সুবিধা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। ওই কর্মকর্তাদের দাবি, গত ৩৮ বছরে রাকাবে প্রায় ৬০ জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয়েছেন।
বিভিন্ন সময়ে মব বিশৃঙ্খলা, অপপ্রচার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোর্তজা অসুস্থ এবং মহাব্যবস্থাপক তাজ উদ্দিন ছুটিতে থাকায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্টাফ অফিসার মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘রাকাব উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করছেন। ’ তিনি আরও বলেন, ‘গুটিকয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চান রাকাবের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব বাধা অতিক্রম করে রাকাব সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। ’ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, সাম্প্রতিক আর্থিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রেখে রাকাবকে আরও গতিশীল ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ভূমিকা আরও জোরদার করা হবে।



















