আজ মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩০°C
সর্বনিম্ন: ২৫°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

রবিউল আউয়ালের পবিত্র ভোরে ধরাধামে আগমন ঘটে মহানবী সা.-এর

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:05:52 pm, Tuesday, 18 August 2026
  • 9

রবিউল আউয়ালের পবিত্র ভোরে ধরাধামে আগমন ঘটে মহানবী সা.-এর

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মরুভূমির নিস্তব্ধতা যেদিন প্রথম কেঁপে উঠেছিল এক নতুন জন্মের স্পন্দনে, ইতিহাস তখনো জানত না, এই একটি ভোর, এই একটি নিঃশ্বাস, গোটা মানবজাতির ললাটলিপি চিরদিনের জন্য পাল্টে দেবে। রবিউল আউয়াল মাসের সেই সোমবার, আমিনার কোল আলোকিত করে যখন পৃথিবীতে এলেন মুহাম্মাদ সা., তখন এক অন্ধকার যুগের বুক চিরে জন্ম নিল এমন এক আলো, যা আজও নেভেনি, নিভবেও না কোনোদিন।

আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। ‘ (সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭) প্রতি বছর রবিউল আউয়ালের আগমনে মুসলিম হৃদয়ে যে উচ্ছ্বাস জাগে, তা কোনো আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয় তা এক গভীর কৃতজ্ঞতা, এক অবিরাম ভালোবাসার পুনর্জাগরণ, প্রতিটি প্রজন্মে যা নতুন করে প্রবাহিত হয়। এতিমের হৃদয়ে জন্ম নেওয়া করুণা তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

জন্মের আগেই হারিয়েছিলেন পিতা আব্দুল্লাহকে, ছয় বছর বয়সে হারালেন মা আমিনাকে, দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহছায়াও রইল না বেশিদিন। আল্লাহ কুরআনে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি, অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন? (সূরা দুহা, ৯৩:৬) এই এতিম, নিঃসঙ্গ শৈশব তাঁকে গড়ে তুলেছিল এমন এক হৃদয়ের অধিকারী হিসেবে, যে হৃদয় জানত বঞ্চনার যন্ত্রণা কতখানি গভীর হতে পারে।

আর সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় সুর করুণা। এই রহমত কোনো অলংকার ছিল না, বরং প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত এক জীবন্ত বাস্তবতা, এতিম শিশু থেকে বৃদ্ধ, শত্রু থেকে বন্ধু, মানুষ থেকে পশুপাখি পর্যন্ত সমানভাবে বিস্তৃত। তায়েফের রক্তাক্ত পথ, ক্ষমার এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত তায়েফের সেই দিনটির কথা ভাবুন।

ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন আশার বাণী হাতে, অথচ ফিরেছিলেন রক্তাক্ত পায়ে, পাথরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে। ফেরেশতা জিবরাইল এসে বললেন, তিনি চাইলে জনপদের দুই পাহাড় একত্র করে তাদের চূর্ণ করে দেওয়া হবে। তিনি জবাব দিলেন, ‘না, আমি আশা করি তাদের বংশধর থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে। ‘ (বুখারি, মুসলিম) এই একটি মুহূর্তেই ধরা পড়ে তাঁর হৃদয়ের গভীরতা, যেখানে প্রতিশোধের বদলে স্থান পেয়েছিল ভবিষ্যতের প্রতি অসীম আশা।

আল্লাহ যাঁকে বলেছেন, ‘আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’। (সূরা কালাম, ৬৮:৪) তাঁর জীবনে এই ঘটনা যেন সেই আয়াতেরই জীবন্ত ব্যাখ্যা। মক্কা বিজয়, প্রতিশোধহীন এক গৌরবগাথা মক্কা বিজয়ের দিনও ছিল এমনই এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। বছরের পর বছর যারা তাঁকে, তাঁর সাহাবিদের নির্যাতন করেছে, প্রিয়জনদের হত্যা করেছে, সেই শত্রুরা যখন বিজয়ীর করুণার প্রার্থী হয়ে মাথা নত করে দাঁড়াল, তখন তিনি উচ্চারণ করলেন সেই কালজয়ী ঘোষণা ‘আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা মুক্ত।

‘ ইতিহাসে খুব কম বিজয়ীই এমন ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন। কুরআন যাঁকে বলেছে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’, উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব, ৩৩:২১) মক্কার সেই সকাল প্রমাণ করে দেয় কেন এই উপাধি চিরন্তন সত্য হয়ে থেকে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে করুণার অবিরাম স্রোত শিশুদের কান্না শুনলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন, যেন মায়ের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত না হয়।

পথের ধারে প্রতিদিন তাঁর ওপর আবর্জনা নিক্ষেপকারী এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে, তিনিই প্রথম তার খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন সহানুভূতি নিয়ে। তাঁর দীর্ঘদিনের খাদেম আনাস বিন মালিক রা. সাক্ষ্য দিয়েছেন, ‘দশ বছর তাঁর সেবা করেছি, অথচ একদিনও তিনি আমাকে বলেননি কেন এই কাজটি করলাম, বা কেন করলাম না। ‘ (বুখারি, মুসলিম) এই ছোট্ট সাক্ষ্যেই ধরা পড়ে তাঁর ধৈর্য আর সহনশীলতার গভীরতা, যা তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচরও প্রতিদিন অনুভব করেছেন।

পরিবারের অন্দরে এক কোমল হৃদয় তাঁর পরিবারের প্রতি ভালোবাসাও ছিল এক অনুপম দৃষ্টান্ত। কন্যা ফাতিমা রা. কে দেখলে তিনি উঠে দাঁড়াতেন, তাঁকে বসাতেন নিজের আসনে, তাঁর হাতে চুম্বন করতেন। নাতি হাসান-হুসাইনকে কাঁধে তুলে খেলতেন, সিজদারত অবস্থায় তাঁরা পিঠে উঠে বসলেও সিজদা দীর্ঘায়িত করতেন, যেন তাদের খেলায় ব্যাঘাত না ঘটে। স্ত্রীদের সাথে তাঁর আচরণ ছিল কোমলতা আর সম্মানে ভরা।

তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। ‘ (তিরমিযি) আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এক মহান নবীর জীবনেও ছিল এমন সাধারণ, ঘরোয়া, মানবিক প্রতিদিনকার ছবি। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রাণে দয়ার পরশ এমনকি পশুপাখির প্রতিও তাঁর হৃদয়ে ছিল অসীম দয়া।

কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া, পশু জবাইয়ের সময় অন্য পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া এসবই তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। এক হাদিসে এসেছে, তৃষ্ণার্ত এক কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (বুখারি, মুসলিম) আরেক বর্ণনায় এসেছে, একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে অনাহারে মৃত্যুর কারণ হওয়ায় এক নারীকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়।

(বুখারি, মুসলিম) এই শিক্ষাগুলো বলে দেয়, তাঁর করুণার সীমানা কতটা বিস্তৃত ছিল, যেখানে মানুষ ছাড়িয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ পেয়েছিল আশ্রয় ও মর্যাদা। অতিথিপরায়ণতা ও ধৈর্যের এক জীবন্ত আয়না তাঁর দরজা কখনো অতিথির জন্য বন্ধ হতো না। ক্ষুধার্ত কেউ এলে নিজের অংশ তুলে দিতেন তার হাতে, নিজে না খেয়ে থেকেও। এক বেদুইন রুক্ষভাবে কথা বলে চাদর টেনে ধরলে, চাদরে দাগ পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি রাগান্বিত না হয়ে হাসিমুখে তার চাহিদা মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

সাহাবিরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি সবার চেয়ে বেশি হাসিমুখে থাকতেন, তাঁর হাসি ছিল মৃদু, উজ্জ্বল, আর প্রতিটি সাক্ষাতেই মানুষ অনুভব করত, সে-ই যেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জন। এক চিরন্তন আলোর আহ্বান রবিউল আউয়াল তাই কেবল একটি মাসের নাম নয় এটি এক আহ্বান, যা প্রতিটি হৃদয়কে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই মহামানবের জীবনের দিকে, যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় ভালোবাসার প্রকৃত সংজ্ঞা।

তাঁর আগমন কেবল ইতিহাসের একটি তারিখ নয়, বরং তা এক চিরন্তন আলোর উৎস, যা মানুষকে শেখায়, ভালোবাসা মানে ক্ষমা, ভালোবাসা মানে করুণা, ভালোবাসা মানে সবচেয়ে দুর্বলতম প্রাণীটির প্রতিও নত হয়ে দাঁড়ানো। প্রতি বছর রবিউল আউয়ালের এই ভোরে সেই একই আলো নতুন করে উদ্ভাসিত হয়, আর মানবহৃদয় খুঁজে পায় তার হারানো পথের দিশা সেই পথ, যা রচিত হয়েছিল চৌদ্দ শতাব্দী আগে, এক অনাথ শিশুর মধ্য দিয়ে, যিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত।

এই ভালোবাসারই প্রতিধ্বনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেজে চলেছে বাংলার কবিদের কণ্ঠেও, যাঁরা তাঁদের কবিতায় বারবার এঁকেছেন এই একই ভালোবাসার ছবি, মরুর বুকে ফোটা সেই আলোকে তুলে এনেছেন বাংলার মাটির ভাষায়। সেই কাব্যধারারই সুরে একটি পঙক্তি দিয়ে শেষ করা যাক এই লেখা, ❝মরুর বুকে ফুটল যে ফুল, সুবাস তার অনির্বাণ, প্রেম-দয়ার দর্শনে যাঁর জীবন অমর মহাগান।

রবিউলের ঊষায় জাগে আজও সেই জ্যোতির্ময় আলো, সালাম হে প্রিয়তম, তোমার পথই চির ভালো।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

বর্ণিল আয়োজনে হাবিপ্রবিতে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদযাপিত

রবিউল আউয়ালের পবিত্র ভোরে ধরাধামে আগমন ঘটে মহানবী সা.-এর

Update Time : 04:05:52 pm, Tuesday, 18 August 2026

মরুভূমির নিস্তব্ধতা যেদিন প্রথম কেঁপে উঠেছিল এক নতুন জন্মের স্পন্দনে, ইতিহাস তখনো জানত না, এই একটি ভোর, এই একটি নিঃশ্বাস, গোটা মানবজাতির ললাটলিপি চিরদিনের জন্য পাল্টে দেবে। রবিউল আউয়াল মাসের সেই সোমবার, আমিনার কোল আলোকিত করে যখন পৃথিবীতে এলেন মুহাম্মাদ সা., তখন এক অন্ধকার যুগের বুক চিরে জন্ম নিল এমন এক আলো, যা আজও নেভেনি, নিভবেও না কোনোদিন।

আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। ‘ (সূরা আম্বিয়া, ২১:১০৭) প্রতি বছর রবিউল আউয়ালের আগমনে মুসলিম হৃদয়ে যে উচ্ছ্বাস জাগে, তা কোনো আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয় তা এক গভীর কৃতজ্ঞতা, এক অবিরাম ভালোবাসার পুনর্জাগরণ, প্রতিটি প্রজন্মে যা নতুন করে প্রবাহিত হয়। এতিমের হৃদয়ে জন্ম নেওয়া করুণা তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

জন্মের আগেই হারিয়েছিলেন পিতা আব্দুল্লাহকে, ছয় বছর বয়সে হারালেন মা আমিনাকে, দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহছায়াও রইল না বেশিদিন। আল্লাহ কুরআনে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি, অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন? (সূরা দুহা, ৯৩:৬) এই এতিম, নিঃসঙ্গ শৈশব তাঁকে গড়ে তুলেছিল এমন এক হৃদয়ের অধিকারী হিসেবে, যে হৃদয় জানত বঞ্চনার যন্ত্রণা কতখানি গভীর হতে পারে।

আর সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় সুর করুণা। এই রহমত কোনো অলংকার ছিল না, বরং প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত এক জীবন্ত বাস্তবতা, এতিম শিশু থেকে বৃদ্ধ, শত্রু থেকে বন্ধু, মানুষ থেকে পশুপাখি পর্যন্ত সমানভাবে বিস্তৃত। তায়েফের রক্তাক্ত পথ, ক্ষমার এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত তায়েফের সেই দিনটির কথা ভাবুন।

ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন আশার বাণী হাতে, অথচ ফিরেছিলেন রক্তাক্ত পায়ে, পাথরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে। ফেরেশতা জিবরাইল এসে বললেন, তিনি চাইলে জনপদের দুই পাহাড় একত্র করে তাদের চূর্ণ করে দেওয়া হবে। তিনি জবাব দিলেন, ‘না, আমি আশা করি তাদের বংশধর থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে। ‘ (বুখারি, মুসলিম) এই একটি মুহূর্তেই ধরা পড়ে তাঁর হৃদয়ের গভীরতা, যেখানে প্রতিশোধের বদলে স্থান পেয়েছিল ভবিষ্যতের প্রতি অসীম আশা।

আল্লাহ যাঁকে বলেছেন, ‘আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’। (সূরা কালাম, ৬৮:৪) তাঁর জীবনে এই ঘটনা যেন সেই আয়াতেরই জীবন্ত ব্যাখ্যা। মক্কা বিজয়, প্রতিশোধহীন এক গৌরবগাথা মক্কা বিজয়ের দিনও ছিল এমনই এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। বছরের পর বছর যারা তাঁকে, তাঁর সাহাবিদের নির্যাতন করেছে, প্রিয়জনদের হত্যা করেছে, সেই শত্রুরা যখন বিজয়ীর করুণার প্রার্থী হয়ে মাথা নত করে দাঁড়াল, তখন তিনি উচ্চারণ করলেন সেই কালজয়ী ঘোষণা ‘আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা মুক্ত।

‘ ইতিহাসে খুব কম বিজয়ীই এমন ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছেন। কুরআন যাঁকে বলেছে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’, উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব, ৩৩:২১) মক্কার সেই সকাল প্রমাণ করে দেয় কেন এই উপাধি চিরন্তন সত্য হয়ে থেকে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে করুণার অবিরাম স্রোত শিশুদের কান্না শুনলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন, যেন মায়ের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত না হয়।

পথের ধারে প্রতিদিন তাঁর ওপর আবর্জনা নিক্ষেপকারী এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে, তিনিই প্রথম তার খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন সহানুভূতি নিয়ে। তাঁর দীর্ঘদিনের খাদেম আনাস বিন মালিক রা. সাক্ষ্য দিয়েছেন, ‘দশ বছর তাঁর সেবা করেছি, অথচ একদিনও তিনি আমাকে বলেননি কেন এই কাজটি করলাম, বা কেন করলাম না। ‘ (বুখারি, মুসলিম) এই ছোট্ট সাক্ষ্যেই ধরা পড়ে তাঁর ধৈর্য আর সহনশীলতার গভীরতা, যা তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচরও প্রতিদিন অনুভব করেছেন।

পরিবারের অন্দরে এক কোমল হৃদয় তাঁর পরিবারের প্রতি ভালোবাসাও ছিল এক অনুপম দৃষ্টান্ত। কন্যা ফাতিমা রা. কে দেখলে তিনি উঠে দাঁড়াতেন, তাঁকে বসাতেন নিজের আসনে, তাঁর হাতে চুম্বন করতেন। নাতি হাসান-হুসাইনকে কাঁধে তুলে খেলতেন, সিজদারত অবস্থায় তাঁরা পিঠে উঠে বসলেও সিজদা দীর্ঘায়িত করতেন, যেন তাদের খেলায় ব্যাঘাত না ঘটে। স্ত্রীদের সাথে তাঁর আচরণ ছিল কোমলতা আর সম্মানে ভরা।

তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। ‘ (তিরমিযি) আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এক মহান নবীর জীবনেও ছিল এমন সাধারণ, ঘরোয়া, মানবিক প্রতিদিনকার ছবি। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রাণে দয়ার পরশ এমনকি পশুপাখির প্রতিও তাঁর হৃদয়ে ছিল অসীম দয়া।

কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া, পশু জবাইয়ের সময় অন্য পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া এসবই তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। এক হাদিসে এসেছে, তৃষ্ণার্ত এক কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (বুখারি, মুসলিম) আরেক বর্ণনায় এসেছে, একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে অনাহারে মৃত্যুর কারণ হওয়ায় এক নারীকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হয়।

(বুখারি, মুসলিম) এই শিক্ষাগুলো বলে দেয়, তাঁর করুণার সীমানা কতটা বিস্তৃত ছিল, যেখানে মানুষ ছাড়িয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ পেয়েছিল আশ্রয় ও মর্যাদা। অতিথিপরায়ণতা ও ধৈর্যের এক জীবন্ত আয়না তাঁর দরজা কখনো অতিথির জন্য বন্ধ হতো না। ক্ষুধার্ত কেউ এলে নিজের অংশ তুলে দিতেন তার হাতে, নিজে না খেয়ে থেকেও। এক বেদুইন রুক্ষভাবে কথা বলে চাদর টেনে ধরলে, চাদরে দাগ পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি রাগান্বিত না হয়ে হাসিমুখে তার চাহিদা মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

সাহাবিরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি সবার চেয়ে বেশি হাসিমুখে থাকতেন, তাঁর হাসি ছিল মৃদু, উজ্জ্বল, আর প্রতিটি সাক্ষাতেই মানুষ অনুভব করত, সে-ই যেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জন। এক চিরন্তন আলোর আহ্বান রবিউল আউয়াল তাই কেবল একটি মাসের নাম নয় এটি এক আহ্বান, যা প্রতিটি হৃদয়কে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই মহামানবের জীবনের দিকে, যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় ভালোবাসার প্রকৃত সংজ্ঞা।

তাঁর আগমন কেবল ইতিহাসের একটি তারিখ নয়, বরং তা এক চিরন্তন আলোর উৎস, যা মানুষকে শেখায়, ভালোবাসা মানে ক্ষমা, ভালোবাসা মানে করুণা, ভালোবাসা মানে সবচেয়ে দুর্বলতম প্রাণীটির প্রতিও নত হয়ে দাঁড়ানো। প্রতি বছর রবিউল আউয়ালের এই ভোরে সেই একই আলো নতুন করে উদ্ভাসিত হয়, আর মানবহৃদয় খুঁজে পায় তার হারানো পথের দিশা সেই পথ, যা রচিত হয়েছিল চৌদ্দ শতাব্দী আগে, এক অনাথ শিশুর মধ্য দিয়ে, যিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত।

এই ভালোবাসারই প্রতিধ্বনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেজে চলেছে বাংলার কবিদের কণ্ঠেও, যাঁরা তাঁদের কবিতায় বারবার এঁকেছেন এই একই ভালোবাসার ছবি, মরুর বুকে ফোটা সেই আলোকে তুলে এনেছেন বাংলার মাটির ভাষায়। সেই কাব্যধারারই সুরে একটি পঙক্তি দিয়ে শেষ করা যাক এই লেখা, ❝মরুর বুকে ফুটল যে ফুল, সুবাস তার অনির্বাণ, প্রেম-দয়ার দর্শনে যাঁর জীবন অমর মহাগান।

রবিউলের ঊষায় জাগে আজও সেই জ্যোতির্ময় আলো, সালাম হে প্রিয়তম, তোমার পথই চির ভালো।