12:24 am, Thursday, 30 July 2026

৪০ বছর ধরে ৪৫০টি অবৈধ দখলে, ১০০টি বসবাসের অনুপযোগী

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:44:10 pm, Wednesday, 29 July 2026
  • 3
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রেলওয়ের শহর নামে পরিচিত লালমনিরহাটে শতবর্ষী ঐতিহ্য বহনকারী রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টারগুলোর একটি বড় অংশ আজ চরম অবহেলায়, অবৈধ দখল আর সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। গত চার দশক ধরে এখানকার প্রায় অর্ধ শতাংশ কোয়ার্টার চলে গেছে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। অকেজো হয়ে পড়ে আছে আরও শতাধিক ভবন। ফলে সরকার একদিকে যেমন বিপুল সম্পদের অপচয়ে রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে এসব পরিত্যক্ত ভবন অপরাধী ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে জননিরাপত্তায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে লালমনিরহাটে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৯০০ সালে পূর্ণাঙ্গ রেল যোগাযোগ চালু হয়। পরবর্তীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ১৯৩০ সালের মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়, যার প্রায় ৯০ শতাংশই লালমনিরহাট পৌর এলাকায় অবস্থিত। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২ হাজার ৯১৭ একর ৫৫ শতক জমির ওপর নির্মিত এসব আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যে বর্তমানে ৮৫০টিরও বেশি স্টাফ কোয়ার্টার রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৩০০টি কোয়ার্টার বৈধভাবে বরাদ্দ আছে। অন্যদিকে প্রায় ৪৫০টি কোয়ার্টারই অবৈধ দখলে চলে গেছে এবং প্রায় ১০০টি ভবন বসবাসের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শহরের স্টোর পাড়া, ড্রাইভার পাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবু পাড়া, শিশুপার্ক ও সাহেব পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত এসব কোয়ার্টারে আসল রেলকর্মীরা আর থাকেন না। বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখলদাররা সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলো বর্তমানে আগাছায় ঢেকে গিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ মাহমুদ ও বিএনপি কলোনির প্রদীপ চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে মাদকসেবনসহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। পাশাপাশি কিছু বরাদ্দপ্রাপ্ত কোয়ার্টার নিয়মবহির্ভূতভাবে সাব-লেট (ভাড়া) দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ের বিশাল অব্যবহৃত জমি ও জরাজীর্ণ ভবন থাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী জানান, অবৈধ দখলে থাকা কোয়ার্টার থেকে সরকার কোনো ভাড়া পাচ্ছে না, ফলে বিশাল অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে। লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান তালুকদার বলেন, রেলওয়ের জমির আধিক্যের কারণে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়। তবে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে বড় সম্ভাবনা উন্মোচন হতে পারে। মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক আফিরুল ইসলাম এবং ‘সেতু সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক মোকলেসুর রহমান আকাশ জানান, অব্যবহৃত জমি পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি বাড়ত। লালমনিরহাট সদর থানার ওসি সাদ আহম্মেদ জানান, পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান নিয়মিত চালমান। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ বিষয়ে রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর হোসেন জানান, সরকারি বিধি অনুযায়ী অব্যবহৃত জমি লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দখলকারীদের অগ্রাধিকারের নিয়ম রয়েছে এবং সম্পদ রক্ষায় অভিযান অব্যাহত আছে। অন্যদিকে লালমনিরহাটের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মো. তসলিম আহমেদ খান বলেন, রেলের জমি ও আবাসিক ভবন দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। জরাজীর্ণ কোয়ার্টার সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে এসব জমি উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

৪০ বছর ধরে ৪৫০টি অবৈধ দখলে, ১০০টি বসবাসের অনুপযোগী

Update Time : 09:44:10 pm, Wednesday, 29 July 2026

রেলওয়ের শহর নামে পরিচিত লালমনিরহাটে শতবর্ষী ঐতিহ্য বহনকারী রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টারগুলোর একটি বড় অংশ আজ চরম অবহেলায়, অবৈধ দখল আর সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। গত চার দশক ধরে এখানকার প্রায় অর্ধ শতাংশ কোয়ার্টার চলে গেছে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। অকেজো হয়ে পড়ে আছে আরও শতাধিক ভবন। ফলে সরকার একদিকে যেমন বিপুল সম্পদের অপচয়ে রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে এসব পরিত্যক্ত ভবন অপরাধী ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে জননিরাপত্তায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে লালমনিরহাটে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৯০০ সালে পূর্ণাঙ্গ রেল যোগাযোগ চালু হয়। পরবর্তীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ১৯৩০ সালের মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়, যার প্রায় ৯০ শতাংশই লালমনিরহাট পৌর এলাকায় অবস্থিত। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২ হাজার ৯১৭ একর ৫৫ শতক জমির ওপর নির্মিত এসব আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যে বর্তমানে ৮৫০টিরও বেশি স্টাফ কোয়ার্টার রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৩০০টি কোয়ার্টার বৈধভাবে বরাদ্দ আছে। অন্যদিকে প্রায় ৪৫০টি কোয়ার্টারই অবৈধ দখলে চলে গেছে এবং প্রায় ১০০টি ভবন বসবাসের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শহরের স্টোর পাড়া, ড্রাইভার পাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবু পাড়া, শিশুপার্ক ও সাহেব পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত এসব কোয়ার্টারে আসল রেলকর্মীরা আর থাকেন না। বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখলদাররা সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলো বর্তমানে আগাছায় ঢেকে গিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ মাহমুদ ও বিএনপি কলোনির প্রদীপ চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে মাদকসেবনসহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। পাশাপাশি কিছু বরাদ্দপ্রাপ্ত কোয়ার্টার নিয়মবহির্ভূতভাবে সাব-লেট (ভাড়া) দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ের বিশাল অব্যবহৃত জমি ও জরাজীর্ণ ভবন থাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী জানান, অবৈধ দখলে থাকা কোয়ার্টার থেকে সরকার কোনো ভাড়া পাচ্ছে না, ফলে বিশাল অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে। লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান তালুকদার বলেন, রেলওয়ের জমির আধিক্যের কারণে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়। তবে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে বড় সম্ভাবনা উন্মোচন হতে পারে। মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক আফিরুল ইসলাম এবং ‘সেতু সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক মোকলেসুর রহমান আকাশ জানান, অব্যবহৃত জমি পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি বাড়ত। লালমনিরহাট সদর থানার ওসি সাদ আহম্মেদ জানান, পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান নিয়মিত চালমান। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ বিষয়ে রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর হোসেন জানান, সরকারি বিধি অনুযায়ী অব্যবহৃত জমি লিজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দখলকারীদের অগ্রাধিকারের নিয়ম রয়েছে এবং সম্পদ রক্ষায় অভিযান অব্যাহত আছে। অন্যদিকে লালমনিরহাটের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মো. তসলিম আহমেদ খান বলেন, রেলের জমি ও আবাসিক ভবন দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। জরাজীর্ণ কোয়ার্টার সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে এসব জমি উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।