দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মাদক নিরাময়কেন্দ্রগুলোর সিংহভাগই এখন চিকিৎসার নামে ভয়াবহ অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতি ও আইনের তোয়াক্কা না করে চলা এসব কেন্দ্রের অধিকাংশেরই নেই কোনো লাইসেন্স।
কোথাও থাকলেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স বা চিকিৎসা সরঞ্জাম। নেই থাকার মতো পরিবেশ। বরং মাদকাসক্তদের সুস্থ করার আড়ালে অনেক কেন্দ্রে রীতিমতো মাদক সেবন ও বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এসব নিরাময়কেন্দ্রকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে।
ফলে সেবার নামে চরম নৈরাজ্য ও প্রতারণার এ অন্ধকার জগৎ এখন জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) যৌথ টাস্কফোর্সের সাধারণ বিবরণী অনুযায়ী, চলতি বছর ঢাকার বিভিন্ন জোনে লাইসেন্সবিহীনভাবে ও চিকিৎসক ছাড়া পরিচালিত প্রায় ৩০টিরও বেশি অননুমোদিত ছোট-বড় কেন্দ্রকে বিভিন্ন মেয়াদে সিলগালা, জরিমানা অথবা কার্যক্রম স্থগিতের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বর্তমানে ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে, যার সিংহভাগেরই বসবাস রাজধানী ঢাকায়। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সুচিকিৎসায় যেখানে দেশজুড়ে বিশেষায়িত সরকারি নিরাময়কেন্দ্রের তীব্র সংকট রয়েছে, সেই সুযোগে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অবৈধ সাইকিয়াট্রিক সেল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে বৈধ ও নিবন্ধিত বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৮৪টি।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র হলো, সরকারি এই নথির বাইরে শুধু ঢাকাতেই হাজারেরও বেশি অবৈধ ও আন্ডারগ্রাউন্ড নিরাময়কেন্দ্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সচল রয়েছে, যা রোগীদের সুস্থ করার বদলে অপরাধীদের ‘সেফহাউস’ এবং টর্চার সেলে (নির্যাতনকেন্দ্রে) পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময়, পুনর্বাসন ও পরামর্শকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী বেশ কিছু কড়া আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়।
লাইসেন্স দেওয়ার মূল কর্তৃপক্ষ হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। আইনি শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অবশ্যই অধিদপ্তরের লাইসেন্স থাকতে হবে। সেই সঙ্গে অন্তত একজন খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক (এমবিবিএস) এবং মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ২০ জন রোগীর জন্য ন্যূনতম একজন সার্টিফায়েড কাউন্সেলর ও নার্স নিযুক্ত থাকা আবশ্যক।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও সুপরিসর কক্ষ, প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা শয্যা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অবৈধ কেন্দ্রগুলোতে কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের উপস্থিতি তো দূরের কথা, সেখানে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করে রোগীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। বেসরকারি সংস্থা হেল্প ফর ইউ-এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট রুনা আক্তার বলেন, তারা চলতি বছরে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনার সূত্র ধরে অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন।
অধিকাংশ ঘটনার পেছনেই রয়েছে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক সদস্যদের বিরোধ। কাউকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার জন্য ‘উন্মাদ’ বানিয়ে জোর করে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নামে আটকে রাখা হয় টাকার বিনিময়ে। নিরাময় নয়, বরং একজন সুস্থ মানুষ সেখান থেকে উন্মাদ হয়ে বের হয়। একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে রুনা আক্তার বলেন, গত ৩০ আগস্ট সকালে ফরিদপুরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকার ‘আল-কারীম মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র’ থেকে ব্যবসায়ী আমিন খানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তার নাকি আচরণ পাল্টে গিয়েছিল আর এ সমস্যা দূর করতে ১০ দিন আগে তাকে এখানে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর পর নিহতের স্বজনরা মরদেহের দুই হাত ও পায়ে রশি দিয়ে বাঁধার গভীর দাগ দেখতে পান। পরিবারের অভিযোগ, সুস্থ মানুষটিকে চিকিৎসার নামে এই সেন্টারে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনার পর জানমালের ভয়ে সেদিনই ওই সেন্টারে থাকা ২৮ রোগী একযোগে মেইন গেট ও দোকানের শাটার ভেঙে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় পরে থানায় মামলাও হয়। এ বিষয়ে রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, বিষয়টির তদন্ত চলছে। নিহতের স্বজনরা যখন নিরাময়কেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেন, তখন নিরাপত্তাহীনতার আসল চিত্র প্রকাশ পায়। ফুটেজে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে গভীর রাতে আমিন খানকে হাত-পা বেঁধে উপুড় করে কয়েকজন মিলে চেপে ধরে রেখেছিল।
নির্যাতনের তীব্রতায় তিনি প্রচণ্ডভাবে ঘেমে যান। আল-কারীমকেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। আমিন খান রাতে অন্যান্য রোগীর ঘুমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিলেন। তখন তাকে জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভোরের দিকে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে মারা যান। গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফুলবাড়িয়ায় ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে কাতার প্রবাসী যুবক ফোরকান মিয়াকে হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ১৯ আগস্ট ক্ষুব্ধ জনতা নিরাময়কেন্দ্রটিতে ভাঙচুর চালায়। এসময় সেখানে চিকিৎসাধীন ৪০ জন রোগী একযোগে গেট ভেঙে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় ‘মায়ের আশ্রয়’ মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে জনতা ব্যাংকের দুপচাঁচিয়া শাখার সিনিয়র অফিসার সামিউল হাসান শুভর রহস্যজনক মৃত্যু হয়।
১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়েছিল। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এটিকে হঠাৎ অসুস্থতা বলে দাবি করলেও শুভর পরিবারের অভিযোগ, তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। গত ৩১ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগের ‘হোলি লাইফ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’ থেকে ১৯ বছর বয়সি ইয়াসিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২২ জানুয়ারি তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এটাকে আত্মহত্যা বলে দাবি করলেও নিহতের বাবা মাসুম মিয়ার অভিযোগ, ইয়াসিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাকে মূলত শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। এই আন্ডারগ্রাউন্ড টর্চার সেলগুলোর বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মাদকাসক্তি বা মানসিক সমস্যা অপরাধ নয়, এটি মস্তিষ্কের অসুখ।
কিন্তু অলিগলিতে গড়ে ওঠা নামসর্বস্ব রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারগুলো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতির বদলে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর করে রোগীদের পথে আনতে চায়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তীব্র মাত্রার ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অবশ করে রাখাও এক ধরনের অপরাধ। একই ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ হামিদ জানান, পারিবারিক বিরোধের জেরে সুস্থ মানুষকে মাদকাসক্ত সাজিয়ে রিহ্যাবে আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করার এবং সম্পত্তি লিখে নেওয়ার একটি অন্ধকার সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে।
কোনো রোগীকে ভর্তি করানোর আগে সেখানে বিএমডিসি নিবন্ধিত সাইকিয়াট্রিস্ট বা সার্টিফায়েড কাউন্সেলর নিয়মিত বসেন কি না, তা যাচাই করা উচিত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির মারুফ বলেন, মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি চিকিৎসায় কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি হলো মূল হাতিয়ার। বৈজ্ঞানিক ডিটক্সিফিকেশন ছাড়া হুট করে মাদকের রোগীকে আটকে রাখলে উইথড্রয়ালের কারণে রোগীর হার্ট অ্যাটাক বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মজিবুর রহমান পাটোয়ারী এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ফরিদপুরের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কিছু নিরাময়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে অমানুষিক নির্যাতন, এমনকি অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আসছে। ফরিদপুরের আল-কারীম মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে ব্যবসায়ী আমিন খানের মৃত্যুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিয়মনীতি ও লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে এক চুলও ছাড় দেওয়া হয় না। প্রতিটি নিরাময়কেন্দ্রে নিয়মিত তদারকি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ ও আইন অমান্যকারী কেন্দ্রগুলো সিলগালা করে দেওয়া হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস করেছে।
এ আইনের আওতায় লাইসেন্স ছাড়া নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনাকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সরকার কেবল আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং একে একটি জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। নিয়মিত টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে অননুমোদিত বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে আকস্মিক চিরুনি অভিযান চালিয়ে সিলগালা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করার আগে অবশ্যই কিছু বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। প্রথমত, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রদত্ত লাইসেন্স; দ্বিতীয়ত, সেন্টারে সার্বক্ষণিক বিএমডিসি নিবন্ধিত ডাক্তার বা সাইকিয়াট্রিস্টের উপস্থিতি এবং সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে উন্মুক্ত পরিবেশ ও স্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থা যাচাই করা।
তারা আরো বলেন, এই অপরাধের নেটওয়ার্ক নির্মূল করতে প্রতিটি রিহ্যাব সেন্টারে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও তার লাইভ অ্যাক্সেস স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া, লাইসেন্সবিহীন সব কেন্দ্র অবিলম্বে সিলগালা করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সরকারি হেল্পলাইন চালু করা এখন সময়ের দাবি।





















