আজ শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩১°C
সর্বনিম্ন: ২২°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ০%

জুড়ীর জাম্বুরায় কৃষকের ভাগ্য বদল, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

  • MIT ERP
  • Update Time : 08:03:43 pm, Saturday, 7 November 2026
  • 2

জুড়ীর জাম্বুরায় কৃষকের ভাগ্য বদল, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একসময় স্থানীয় বাজারে তেমন চাহিদা ছিল না। উৎপাদিত জাম্বুরা বিক্রি করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো কৃষকদের। সময়ের ব্যবধানে সেই জাম্বুরাই এখন হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য।

স্বাদ, আকার ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ফলের চাহিদা বাড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সিলেট বিভাগের গণ্ডি পেরিয়ে জুড়ীর জাম্বুরা এখন যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। এতে বাড়ছে কৃষকের আয়, প্রসারিত হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। এবার দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার টিলাবেষ্টিত গ্রাম ও বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকভাবে জন্মে জাম্বুরা। স্থানীয়ভাবে ‘মাতু জামির’ নামেও পরিচিত এ ফলের স্বাদে রয়েছে টক, মিষ্টি ও হালকা তিতার মিশ্রণ। স্বতন্ত্র স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জুড়ীর জাম্বুরা। অনেকে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি জাম্বুরা চাষ করে বাড়তি আয় করছেন।

আবার কোনো কোনো পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ ফল। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুড়ীর হায়াছড়া, শুকনাছড়া, জামকান্দি, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, বিনোদপুর, লালছড়া, রূপাছড়া, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, কুচাইরতল, কচুরগুল ও পুটিছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জাম্বুরার আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে রয়েছে ১০ হাজারের মতো জাম্বুরাগাছ।

চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। কৃষকদের ভাষ্য, একটি পরিণত জাম্বুরাগাছে সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০টি ফল ধরে। কোনো কোনো গাছে ফলের সংখ্যা এক হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তুলনামূলক কম খরচে চাষাবাদ এবং বাজারে বাড়তি চাহিদা থাকায় জাম্বুরা এখন কৃষকদের কাছে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় একটি ফল। সাধারণত আশ্বিন থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত গাছে ফল থাকে।

তবে আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফল বেশি পরিপক্ব হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, জুড়ীর লাঠিটিলা সড়কের কালামাটি নামের ত্রিমুখী পয়েন্টটি মৌসুমে পরিণত হয় জাম্বুরার বেচাকেনার কেন্দ্রে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পিকআপভ্যানে করে ফল নিয়ে আসছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। সেখানে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। পরে বড় ট্রাকে করে এসব জাম্বুরা পাঠানো হচ্ছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন ফলের বাজারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কালা মিয়া ও হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁরা প্রতিবছর অগ্রিম চুক্তিতে একাধিক জাম্বুরাবাগান কিনে নেন। মৌসুমে শ্রমিক দিয়ে ফল সংগ্রহ করে বাছাই ও বস্তাবন্দী করার পর ঢাকার যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পাঠান। সেখানে আকার ও মানভেদে প্রতি বস্তা জাম্বুরা এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফল ব্যবসায়ী মারুফ আহমদ বলেন, জুড়ীর জাম্বুরার চাহিদা তাঁদের বাজারে অনেক বেশি।

স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় ক্রেতারা এ ফল পছন্দ করেন। ফলে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। দেশের সর্ববৃহৎ অনলাইন ফল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত প্রিমিয়াম ফ্রুটসের স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ আল সাগর জানান, গত দুই বছর ধরে তাঁরা জুড়ী থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। চাহিদা বাড়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।

ভবিষ্যতে জুড়ীর জাম্বুরা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। তাঁর মতে, এ ফলের স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। জুড়ীর জাম্বুরার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-১’ ও ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-২’ নামে দুটি জাত শনাক্ত ও উদ্ভাবন করা হয়।

আকারে বড় ও সুস্বাদু এ জাত দুটির মধ্যে একটির শাঁস গাঢ় লাল, অন্যটির শাঁস আংশিক সাদা। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, শুকনাছড়া গ্রামের প্রবীণ কমলাচাষি প্রয়াত ইব্রাহিম আলীর বাড়িতে এসব জাতের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া জুড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে আরও ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের সন্ধান পেয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতিমধ্যে বাতাবিলেবু-১, বাতাবিলেবু-২ ও বারি বাতাবিলেবু-৫-এর চারা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের বাগানের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, “জুড়ীতে জাম্বুরা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো জন্মে। এখানকার জাম্বুরার জাতগুলো অত্যন্ত ভালো।

সারাদেশে বাতাবিলেবুর চাহিদা থাকলেও বাজারে সব সময় মানসম্মত জাতের ফল পাওয়া যায় না। ” তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “জুড়ীর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। আমি প্রত্যেক কৃষককে উদাত্ত আহ্বান জানাই, জাম্বুরা চাষের এই ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে।

” তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি জাম্বুরা চাষে কিছু সমস্যাও রয়েছে। শুকনাছড়া, লালছড়া ও জড়িছড়া এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, একসময় বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদিত ফল বিক্রি নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি ফল পাঠানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তবে গান্ধিপোকাসহ বিভিন্ন রোগবালাই এবং কাঠবিড়ালির উপদ্রবে অনেক ফল নষ্ট হচ্ছে।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি বিভাগের কার্যকর পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চান তাঁরা। কৃষি ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জুড়ীর জাম্বুরাকে বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলতে উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি উপযুক্ত প্যাকেজিং ও গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একসময় যে ফল বিক্রি করা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো, সেই জাম্বুরাই এখন তাঁদের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পরিকল্পিত উদ্যোগ, উন্নত চাষাবাদ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে জুড়ীর ঐতিহ্যবাহী জাম্বুরা একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেতে পারে।

জুড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ মাহমুদুল আলম বলেন, জুড়ী উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে জাম্বুরা চাষ হচ্ছে। এ বছর এখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন জাম্বুরা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একসময় যে জাম্বুরা পাইকাররা মাত্র ২ টাকা দরে কিনে নিতেন, বর্তমানে সেই ফলের বাজারমূল্য বেড়েছে। এ বছর প্রিমিয়াম ফ্রুটস নামের একটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বিক্রির জন্য স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করছে।

এতে প্রতিটি জাম্বুরা প্রায় ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করতে পারছেন কৃষকেরা। ফলে তাঁরা আগের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন এবং জাম্বুরা চাষে আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় মাদ্রাসায় হাজিরা খাতায় ১২০ শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত ১০

জুড়ীর জাম্বুরায় কৃষকের ভাগ্য বদল, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

Update Time : 08:03:43 pm, Saturday, 7 November 2026

একসময় স্থানীয় বাজারে তেমন চাহিদা ছিল না। উৎপাদিত জাম্বুরা বিক্রি করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো কৃষকদের। সময়ের ব্যবধানে সেই জাম্বুরাই এখন হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য।

স্বাদ, আকার ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ফলের চাহিদা বাড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সিলেট বিভাগের গণ্ডি পেরিয়ে জুড়ীর জাম্বুরা এখন যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। এতে বাড়ছে কৃষকের আয়, প্রসারিত হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। এবার দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার টিলাবেষ্টিত গ্রাম ও বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকভাবে জন্মে জাম্বুরা। স্থানীয়ভাবে ‘মাতু জামির’ নামেও পরিচিত এ ফলের স্বাদে রয়েছে টক, মিষ্টি ও হালকা তিতার মিশ্রণ। স্বতন্ত্র স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জুড়ীর জাম্বুরা। অনেকে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি জাম্বুরা চাষ করে বাড়তি আয় করছেন।

আবার কোনো কোনো পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ ফল। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুড়ীর হায়াছড়া, শুকনাছড়া, জামকান্দি, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, বিনোদপুর, লালছড়া, রূপাছড়া, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, কুচাইরতল, কচুরগুল ও পুটিছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জাম্বুরার আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে রয়েছে ১০ হাজারের মতো জাম্বুরাগাছ।

চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। কৃষকদের ভাষ্য, একটি পরিণত জাম্বুরাগাছে সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০টি ফল ধরে। কোনো কোনো গাছে ফলের সংখ্যা এক হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তুলনামূলক কম খরচে চাষাবাদ এবং বাজারে বাড়তি চাহিদা থাকায় জাম্বুরা এখন কৃষকদের কাছে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় একটি ফল। সাধারণত আশ্বিন থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত গাছে ফল থাকে।

তবে আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফল বেশি পরিপক্ব হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, জুড়ীর লাঠিটিলা সড়কের কালামাটি নামের ত্রিমুখী পয়েন্টটি মৌসুমে পরিণত হয় জাম্বুরার বেচাকেনার কেন্দ্রে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পিকআপভ্যানে করে ফল নিয়ে আসছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। সেখানে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে। পরে বড় ট্রাকে করে এসব জাম্বুরা পাঠানো হচ্ছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন ফলের বাজারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী কালা মিয়া ও হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁরা প্রতিবছর অগ্রিম চুক্তিতে একাধিক জাম্বুরাবাগান কিনে নেন। মৌসুমে শ্রমিক দিয়ে ফল সংগ্রহ করে বাছাই ও বস্তাবন্দী করার পর ঢাকার যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পাঠান। সেখানে আকার ও মানভেদে প্রতি বস্তা জাম্বুরা এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফল ব্যবসায়ী মারুফ আহমদ বলেন, জুড়ীর জাম্বুরার চাহিদা তাঁদের বাজারে অনেক বেশি।

স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় ক্রেতারা এ ফল পছন্দ করেন। ফলে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। দেশের সর্ববৃহৎ অনলাইন ফল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত প্রিমিয়াম ফ্রুটসের স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ আল সাগর জানান, গত দুই বছর ধরে তাঁরা জুড়ী থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। চাহিদা বাড়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।

ভবিষ্যতে জুড়ীর জাম্বুরা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। তাঁর মতে, এ ফলের স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। জুড়ীর জাম্বুরার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-১’ ও ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-২’ নামে দুটি জাত শনাক্ত ও উদ্ভাবন করা হয়।

আকারে বড় ও সুস্বাদু এ জাত দুটির মধ্যে একটির শাঁস গাঢ় লাল, অন্যটির শাঁস আংশিক সাদা। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, শুকনাছড়া গ্রামের প্রবীণ কমলাচাষি প্রয়াত ইব্রাহিম আলীর বাড়িতে এসব জাতের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া জুড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে আরও ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের সন্ধান পেয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতিমধ্যে বাতাবিলেবু-১, বাতাবিলেবু-২ ও বারি বাতাবিলেবু-৫-এর চারা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের বাগানের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, “জুড়ীতে জাম্বুরা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো জন্মে। এখানকার জাম্বুরার জাতগুলো অত্যন্ত ভালো।

সারাদেশে বাতাবিলেবুর চাহিদা থাকলেও বাজারে সব সময় মানসম্মত জাতের ফল পাওয়া যায় না। ” তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, “জুড়ীর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে। আমি প্রত্যেক কৃষককে উদাত্ত আহ্বান জানাই, জাম্বুরা চাষের এই ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে।

” তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি জাম্বুরা চাষে কিছু সমস্যাও রয়েছে। শুকনাছড়া, লালছড়া ও জড়িছড়া এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, একসময় বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদিত ফল বিক্রি নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি ফল পাঠানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তবে গান্ধিপোকাসহ বিভিন্ন রোগবালাই এবং কাঠবিড়ালির উপদ্রবে অনেক ফল নষ্ট হচ্ছে।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি বিভাগের কার্যকর পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চান তাঁরা। কৃষি ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জুড়ীর জাম্বুরাকে বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলতে উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি উপযুক্ত প্যাকেজিং ও গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একসময় যে ফল বিক্রি করা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো, সেই জাম্বুরাই এখন তাঁদের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পরিকল্পিত উদ্যোগ, উন্নত চাষাবাদ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে জুড়ীর ঐতিহ্যবাহী জাম্বুরা একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেতে পারে।

জুড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ মাহমুদুল আলম বলেন, জুড়ী উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে জাম্বুরা চাষ হচ্ছে। এ বছর এখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন জাম্বুরা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একসময় যে জাম্বুরা পাইকাররা মাত্র ২ টাকা দরে কিনে নিতেন, বর্তমানে সেই ফলের বাজারমূল্য বেড়েছে। এ বছর প্রিমিয়াম ফ্রুটস নামের একটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বিক্রির জন্য স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করছে।

এতে প্রতিটি জাম্বুরা প্রায় ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করতে পারছেন কৃষকেরা। ফলে তাঁরা আগের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন এবং জাম্বুরা চাষে আরও উৎসাহিত হচ্ছে।