রনি ফকির ও পলাশ শেখ দুজনেরই স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে পরিবারের অভাব ঘোচাবেন, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। সেই স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশিয়ায়। কিন্তু উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে দালালের খপ্পরে পড়ে জড়িয়ে পড়েন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।
শেষ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন রনি। আর একই হামলায় একটি হাত হারিয়ে মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পলাশ। যে ছেলেদের উপার্জনে সংসারে সচ্ছলতা ফেরার কথা ছিল, তাদের একজনের জন্য এখন পরিবারের অপেক্ষা নিথর দেহের, অন্যজনের জন্য জীবিত ফিরে আসার। গোপালগঞ্জের দুই পরিবারের ঘরে এখন স্বপ্নের বদলে শুধুই কান্না। নিহত রনি ফকির বোড়াশী গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে।
আর পলাশ শেখ ঘোষেরচর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের অভিযোগ, কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে তাদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয় দালাল চক্র। পরে স্বল্প সময়ের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার জাবালে নূর নামে একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় যান রনি।
কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরির আশ্বাসে তার সঙ্গে গোপালগঞ্জের আরও দুই যুবকসহ দেশের অন্তত ৩০ জন রাশিয়ায় পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের নির্মাণকাজে নিয়োগ না দিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। গত ২৯ অক্টোবর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল রনির। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথোপকথন। এর কিছুক্ষণ পর ইউক্রেনের একটি ড্রোন হামলায় নিহত হন তিনি।
তার সঙ্গে যুদ্ধে থাকা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার এক যুবক প্রথমে পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানান। পরে মরদেহের ছবি পাঠালে তা দেখে রনিকে শনাক্ত করেন তার বাবা-মা। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকে স্তব্ধ রনির পরিবার। যে বাবা-মা ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন একটু ভালো থাকার আশায়, তারাই এখন সন্তানের মরদেহের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখে দেশের মাটিতে দাফন করতে চান তারা। রনির বাবা নুর ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে দালাল চক্র আমার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছে। ভেবেছিলাম ছেলে বিদেশে গিয়ে কাজ করবে, সংসারের অভাব দূর হবে। কিন্তু তারা সেনাবাহিনীর হাতে বিক্রি করে দিয়েছে। অন্যদিকে, একই উপজেলার ঘোষেরচর গ্রামের পলাশ শেখের জীবনেও নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়।
ছোটবেলায় মাকে হারান তিনি। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর পলাশসহ তিন ভাইবোনের দায়িত্ব পড়ে বৃদ্ধ নানা মোশারফ হোসেনের ওপর। অনেক কষ্টে বড় হওয়া পলাশ জীবিকার তাগিদে সবজি ব্যবসা শুরু করেন। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে ধারদেনা করে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল রেজার মাধ্যমে জাবালে নূর নামের এজেন্সির সহযোগিতায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর পলাশকেও সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পরে যুদ্ধে পাঠানো হলে ড্রোন হামলায় তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত এক মাস ধরে তিনি মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া পলাশ এখন নিজেই অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। একটি হাত হারিয়ে হাসপাতালের বিছানায় দিন কাটছে তার। দেশে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু কীভাবে, কবে ফিরবেনÑ তা জানেন না পরিবারের সদস্যরা।
পলাশের বাবা জামিল শেখ ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ছেলের চিকিৎসা নিশ্চিত করে দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে তাকে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।





















