ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো আর বর্ষায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই নদী পারাপার হতে হচ্ছে শত শত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
নরসিংদী সদর উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত আলোকবালী ইউনিয়নের খোদাদিলা গ্রাম। আশপাশের ৯টি গ্রামে বসবাস প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। নদীর অপর পাড়ে রায়পুরা উপজেলার হাইরমারা ইউনিয়নের মনিপুরা গ্রাম। শিক্ষা, চিকিৎসা, হাট-বাজারসহ নানা প্রয়োজনে দুই গ্রামের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই নদীপথ। স্থায়ী সেতু না থাকায় বছরের পর বছর নৌকা আর অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলছে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত।
শুষ্ক মৌসুমে বাঁশ-কাঠের সাঁকো কিছুটা স্বস্তি দিলেও বর্ষায় পানির উচ্চতা বাড়লে সেটিও আর ব্যবহার করা যায় না। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে পারাপারের একমাত্র ভরসা। এই নদীপথের নিয়মিত যাত্রীদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী। খোদাদিলা ও আশপাশের চরাঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় হাজারো শিক্ষার্থী নদী পেরিয়ে মনিপুরা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।
নৌকার অপেক্ষা, প্রতিকূল আবহাওয়া আর সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌকা না পেলে নদী পারাপারের জন্য দীর্ঘক্ষণ ঘাটে অপেক্ষা করতে গিয়ে প্রায়শই তাদের ক্লাস মিস হয়। এতে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। খোদাদিলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, এই নদীপথ শুধু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা।
মনিপুরার ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক হাটে প্রতি সোমবার আশপাশের বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে আসেন হাজারো মানুষ। কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ এই নদীপথ। স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে বারবার সেতুর আশ্বাস দিলেও নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতির আর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয়দের দাবি, মনিপুরা ও খোদাদিলা দুই গ্রামের মধ্যে নির্মাণ করা হোক একটি স্থায়ী সেতু। তাদের প্রত্যাশা, সেতুটি নির্মিত হলে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। আলোকবালী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম সরকার বলেন, মনিপুরা ও খোদাদিলা দুই গ্রামের মধ্যে সেতুটি নির্মিত হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে জরুরি চিকিৎসাসেবায় এবং নদী পারাপারের কারণে রোগীদের নরসিংদী শহরে নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এ বিষয়ে নরসিংদী এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফুলকাম বাদশা জানান, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পর মনিপুরা-খোদাদিলা দুই গ্রামের মধ্যে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সমীক্ষা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সমীক্ষার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।
তবে সেতু নির্মাণের বাস্তব অগ্রগতির জন্য প্রকল্প অনুমোদনসহ আরও কয়েকটি ধাপ পার হতে হবে। বছরের পর বছর নদীনির্ভর জীবন কাটানো দুই পাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, মেঘনা নদীর ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুই তীরের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।
তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগ সংকটের সমাধান করবে।






















