একদিকে কাঁসর-ঘণ্টা আর উলুধ্বনির সুর, অন্যদিকে মাত্র ছয় ফুট ব্যবধানে ভেসে আসে আজানের পবিত্র ধ্বনি। কোনো বিভাজন ছাড়া একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়। লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ি এলাকায় অবস্থিত পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কেন্দ্রীয় মন্দির যুগের পর যুগ ধরে বহন করে চলছে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতার এক মহিমান্বিত প্রতীক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩১ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের সুবিধায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মতিক্রমে একই প্রাঙ্গণে নির্মিত হয় মসজিদ। সেই থেকে একই উঠানে নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়মে উচ্চারিত হয়ে আসছে আল্লাহর জিকির ও দেব-দেবীর স্তুতি। প্রায় এক শতাব্দী ধরে দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বজায় রয়েছে শ্রদ্ধাবোধ ও শৃঙ্খলা। প্রতিদিন আজানের পর থেকে মসজিদে জামাত শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাক-ঢোল, কাঁসর ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়।
নামাজ শেষে আবার স্বাভাবিকতায় শুরু হয় মন্দিরের আরতি ও ধর্মীয় আচার। শারদীয় দুর্গাপূজা কিংবা পবিত্র ঈদ উৎসবে এ প্রাঙ্গণের রূপ আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। পূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবকেরা নামাজের পরিবেশ শান্ত রাখতে ভূমিকা রাখেন, আর ঈদের দিন মুসলিমরা পূজাম-পে গিয়ে শুভেচ্ছা ভাগাভাগি করে নেন। এলাকার প্রবীণেরা জানান, ‘তারা বাপ-দাদার আমল থেকে ওই স্থানে যৌথ উপাসনালয় দেখে আসছেন।
এ পর্যন্ত কখনো কোনো বিবাদ বা অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটেনি। ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বাঁধন তাদের সবার। ’ মন্দিরের ভক্ত বাবু কিশোর চন্দ্র বলেন, ‘আজানের ধ্বনি কানে শোনামাত্রই আমাদের ঢাকিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঠি থামিয়ে দেন। এটি আমাদের শ্রদ্ধাবোধের অঙ্গ হয়ে গেছে। ’ একই সুর ব্যক্ত করে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, যুগ যুগ ধরে শান্তিতে ইবাদত করে আসছি।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ আমাদের এই প্রাঙ্গণ। ’ গত শুক্রবার রাতে ওই প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বের নানা স্থানে যখন অস্থিরতা দৃশ্যমান, তখন লালমনিরহাটের এই যৌথ আঙিনা পৃথিবীর সামনে শান্তি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।





















