স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ২৬ মাস পার হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সবচেয়ে বড় সংস্থা পুলিশ বাহিনীতে তারই ভূত এখনো রয়ে গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল, বাধ্যতামূলক অবসর এবং বরখাস্তের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
এত কিছুর পরও সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তার উপরের পদমর্যাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানামুখী ষড়যন্ত্রে যুক্ত। পুলিশের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পলায়ন, নাশকতা সৃষ্টি, কর্মস্থলে অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার পর থেকে বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী পুলিশ বা পুলিশ লীগের সদস্যরা আগের চেয়েও সতর্ক হয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও তথ্য পাচারে নতুন কৌশলের তথ্য দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শতাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বর্তমানে চাকরি হারানোর চরম ঝুঁকিতে বা আতঙ্কে রয়েছেন।
এর বাইরে ৬ হাজার ৫৩৯ জন পরিদর্শকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখে নির্দেশনাও দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তার উপরের পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তথ্য দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কর্মস্থল থেকে ‘পলায়নের’ অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এই ৬২ জনের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে; বিভাগীয় মামলা চলছে বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে। ২০১০ সালের পর থেকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশে নিয়োগ পাওয়া এবং সময়কালে যেসব ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা গুম-খুন, দুর্নীতি-অর্থপাচার ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের একাধিক সংস্থা অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি তাদের অপরাধের ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত সহকারী পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, পলায়ন, নাশকতা সৃষ্টি, অসদাচরণ এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বেআইনিভাবে গুলি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আরও শতাধিক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে। এই তালিকায় বেশির ভাগই সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি এবং অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সাধারণ আদালতে অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপ এবং নিয়মিত বদলি বা ওএসডি করার কারণে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি হারানোর একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের শতাধিক কর্মকর্তা বর্তমানে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন এবং যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
বিশেষ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দমন-পীড়ন, বেআইনিভাবে গুলি করার নির্দেশ ও প্ররোচনা, দুর্নীতি এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর আত্মগোপন বা দেশত্যাগের চেষ্টার অভিযোগে তাদের ওপর এই নজরদারি রাখা হচ্ছে। আন্দোলনের পর বাহিনীর অনেক বিতর্কিত কর্মকর্তা এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন বা অবৈধ উপায়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সীমান্ত এলাকা এবং দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কড়া নজরদারি বসিয়েছে।
ইতিমধ্যে যেসব কর্মকর্তা বিদেশে পালিয়ে গেছেন বা যাওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন, ইন্টারপোল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সন্দেহভাজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের গতিবিধি ট্র্যাক করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় আসামি হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই নজরদারিতে থাকা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশে শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে।
সরকারি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ষড়যন্ত্রে জড়িত বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। ইতিমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় এবং আরও অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান থাকায় বাহিনীর ভেতরে থাকা দুষ্টরা সর্তক হয়েছেন, কাজের গতিও ফিরে এসেছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি, অভিযান ও আইনের আওতায় এনে শাস্তি মুখোমুখি করতে পারলে জনগণের জানমালে নিরাপত্তার পাশাপাশি আস্থাও ফিরবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। উচ্চাভিলাষী অপেশাদার কিছু পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে পুলিশের বিভিন্ন আইন ও প্রবিধান লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেন। একইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক তদবিরে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এমনকি বিসিএস পুলিশ ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগেও ব্যাপক হারে দলীয়করণ করা হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গোপন তদন্তের মুখে পড়েছেন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা। এরই মধ্যে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকটি ব্যাচের গোপন তদন্ত শুরু হয়েছে। নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদের বিষয়েও চলছে একাধিক গোপন তদন্ত। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।
তদন্তে হাসিনা সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের অতীত ইতিহাস যাচাই শুরু করেছে সরকারের বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা। পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের এক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।
জুলাই-আগস্টে চলা গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে অনেক কর্মকর্তার বিভাগীয় মামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ের পর তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অভিযুক্তদের চূড়ান্ত বরখাস্তের আগে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১টি বিএসএস পরীক্ষায় মোট ১ হাজার ৩৮৩ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিয়োগ ও নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে উপপরিদর্শক (এসআই), সার্জেন্ট ও কনস্টেবল পদেও বড় নিয়োগ হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে গোপন তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ক্যাডেট এসআইদের বিষয়েও অনুসন্ধান করার পরিকল্পনা পুলিশের রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান চব্বিশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ডিএমপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালানো এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ডিএমপির একাধিক সাবেক কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার এবং ডিবি ও সিটিটিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদের মধ্যে অনেকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন, আর একটি বড় অংশ বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। বিমানবন্দর এবং সীমান্ত এলাকায় কড়া ওয়াচ-লিস্ট দেওয়া হয়েছে, যাতে নজরদারিতে থাকা ডিএমপির কোনো কর্মকর্তা দেশত্যাগ করতে না পারেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২৮, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৪০ ও ৪১তম বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের নির্দিষ্ট একটি অংশের নাম উল্লেখ করে ফের প্রাক-চাকরি বৃত্তান্ত যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ লক্ষ্যে প্রার্থীর সম্পর্কে একজন কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে অনুসন্ধান সম্পন্ন করার জন্য বলা হয়। যেসব বিষয় অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে নাম, জন্ম তারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল এবং একাধিক মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ও ফেসবুক আইডি, টিআইএন (যদি থাকে), পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে) উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্য অতীতে যে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন তার নাম, সেশন ও অধ্যয়নের বিষয় এবং অবস্থান বা আবাসিক হলের নাম, ওই সময় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্য অন্য জেলায় অধ্যয়ন করে থাকলে সংশ্লিষ্ট জেলায় যোগাযোগপূর্বক তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হতে হবে (রক্ষিত মূল ভেরিফিকেশন নথি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম করে ফের অধ্যয়নকালীন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে)।
কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন করে বন্ধুর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট থানার রেকর্ড (সিডিএমএসের তথ্য যাচাই) করতে বলা হয়েছে। ওই প্রার্থী বা কর্মকর্তার রাজনৈতিক সংশ্লেষণ (যদি থাকে) যাচাই করা এবং কোনোরূপ জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় জড়িত কি না, যাচাই করতে বলা হয়েছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসে এসএসপি পদে ১৮০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই সময় থেকে পুলিশে রাজনৈতিক পরিচয়ে লোক নিয়োগ শুরু হয়। ২০১৭ সালে ৩৫তম বিসিএসে নিয়োগ দেওয়া হয় ১১৪ জনকে। ২০১৮ সালে ৩৬তম বিসিএসে নিয়োগ দেওয়া হয় ১১৫ জনকে এবং ২০১৯ সালে ৩৭তম বিসিএসে নিয়োগ দেওয়া হয় ৯৭ জনকে। এ ছাড়া ২০২২ সালের ১ নভেম্বর ৪০তম বিসিএসে ৭১ জন এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৬২ জনই ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ২০১১ সালে ২৯তম বিসিএসে ৩৫ জন, ২০১২ সালে ৩০তম বিসিএসে ১৮৪ জন, ২০১৩ সালে ৩১তম বিসিএসে ১৮৪ জন, ২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএসে ১৫৫ জন এবং ২০১৬ সালে ৩৪তম বিসিএসে ১৪৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদেরও গোপন অনুসন্ধানের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বাহিনীর হাইকমান্ড চরম বিব্রত অবস্থায় পড়েছে এবং সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
ভাবমূর্তির সংকটে থাকার পাশপাশি জনগণের কাছেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অভিযান চালানো, তদন্ত, তদন্ত তদারকি, উদ্ধার, দাঙ্গা দমন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ মাঠপর্যায়ের বড় যেকোনো কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং জনগণের কাছে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থাভাজন ওসি বাছাইয়ের লক্ষ্যে ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের বিষয়ে গোপন তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত বিশেষ চিঠি পুলিশের সব ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যম গুগল ফরম লিংক ব্যবহার করে পরিদর্শকদের ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, বর্তমান ও অতীত কর্মস্থলের বিবরণ, অতীতে পাওয়া দণ্ড থাকলে তার বিবরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। বাংলাদেশ পুলিশে পরিদর্শকের পদ ৬ হাজার ৯৫৭টি।
তার বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ৬ হাজার ৫৩৯ জন। এদের মধ্যে ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদে ১২৮ নারীসহ কর্মরত মোট ৪ হাজার ৭১৯ জন। ইন্সপেক্টর (টিটি) পদে ৯৮৪ জন এবং ইন্সপেক্টর (সশস্ত্র) পদে কর্মরত ৮৩৬ জন। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং শাস্তি পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ কেন্দ্রিক ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকার কারণে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে। এই ৫৭ কর্মকর্তার মধ্যে বিভাগীয় মামলায় ২৮ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তাদের মধ্যে দণ্ডিত পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার কারণে পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। একই ঘটনায় আরও ৩০ পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।
৫ আগস্ট ২০২৪ কেন্দ্রিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্য পুলিশ পরিদর্শকদের বিরুদ্ধেও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।





















